শুভ নববর্ষ : এই রাজনীতির চেহারা বদলাতে হবে

0
8
শুভ নববর্ষ : এই রাজনীতির চেহারা বদলাতে হবে
মাহমুদুর রহমান মান্না

প্রিয় পাঠক, শুভ নববর্ষ। এটা দিয়েই শুরু করছি। নতুন বছর কতটা শুভ হবে তা বলতে পারছি না। কারণ যে বছরের ঘাড়ে চড়ে নতুনের সিঁড়িতে পা রাখলাম তা কোনোভাবেই শুভ ছিল না। কিন্তু যখন সেই বছরটা শুরু হয়েছিল তখন নিশ্চয়ই আমরা সবাই সবার, সবাই মিলে দেশের শুভ কামনা করেছিলাম। সেই বছরটি যে শুভ যায়নি তা বছরের শেষে এসে একেবারে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। প্রায় পাঁচ বছর অর্থনীতিতে যে সাফল্য আমরা অর্জন করেছিলাম তা ভয়াবহভাবে বর্জিত হতে শুরু করে বছরের শেষ দিকে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক বক্তব্য অনুযায়ী এক লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। অর্থনীতির সবচেয়ে গতিশীল চাকা গার্মেন্ট শিল্প খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। গত মাসের বেতন দেওয়া যাবে কীভাবে সেই ভাবনায় মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন তারা। বিগত ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে বন্দর থেকে আমাদের যা আয় তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাজীবন স্তব্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ভবিষ্যৎ ভেবে অভিভাবকরা দিশাহারা। উপর্যুপরি হরতাল-অবরোধে জনজীবন বিপর্যস্ত। সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা প্রায় অচল। এরকম একটি অগ্নিগর্ভ বছরের মাথায় পা দিয়ে এসেছে ২০১৪। বছরের শেষের একদিন বাকি থাকতেই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে লাগাতার অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের শেষে বেশ কয়েক দফা অবরোধ কর্মসূচির পর তারা সারা দেশ থেকে ঢাকা অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ঘোষণা করেছিল। সীমাহীন পুলিশি নির্যাতন আর গণগ্রেফতারের কারণে সেই অভিযাত্রা হতে পারেনি। ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ ছিল। সমাবেশের জায়গাও ঘিরে রেখেছিল যৌথবাহিনী, একটা মাছি পর্যন্ত ঢুকতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো প্রেসক্লাবের মধ্যে বিরোধী দলের সমর্থক সাংবাদিকরা মিছিল শুরু করেছিলেন। কিন্তু সরকারি সাংবাদিকদের প্রতিবাদ এবং বাইরে থেকে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মোটামুটি দীর্ঘ প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা। সেটাকে এক নারকীয় হামলায় পণ্ড করে দেয় সরকার পক্ষ। হাইকোর্টের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লেখা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ করব না। টেলিভিশনের কল্যাণে পাঠকরা সেটা সরাসরি দেখতে পেয়েছেন। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, সুপ্রিমকোর্টের জানাজা হয়ে গেছে।

পাঠকবৃন্দ আমি যদি বলি আসলে রাজনীতিরই জানাজা হয়ে গেছে। তা হলে কি কথাটি ভুল বলা হবে? নিছক ক্ষমতার লড়াইয়ে দেশের কবর রচনা করা হচ্ছে। নতুন বছরের শুরু হওয়ার চার দিন পরেই দেশের দশম জাতীয় সংসদের তথাকথিত নির্বাচন। এটা কোন নির্বাচন? আশা করছি বছরের প্রথম দিনে আমার এই লেখা আপনাদের হাতে পৌঁছবে। সারা দেশের কথা বলতে পারব না। কিন্তু ঢাকা শহরের অলি-গলিতে খুঁজেও নির্বাচনের পোস্টার পাওয়া কষ্টকর। গুলশান এলাকায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কিছু পোস্টার চোখে পড়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে কোথায় আছেন, হাসপাতালে নাকি গলফ কোর্টে তা জানি না। কিংবা আমার মনে হয় তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনিও হয়তো বলবেন আমি তো প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। আমি কেন পোস্টার দিতে যাব? এক রসিক আমাকে বলছিলেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন হয়তো সরকারই এই পোস্টার লাগিয়েছে। এরশাদ মাঠে না থাকলে দেখতে খুবই খারাপ দেখায়। তসলিমা নাসরিনের একটি কলামের শিরোনাম ছিল- ‘যাব না কেন? যাব’ সম্ভবত সেটা পড়েই একুশের বইমেলার একটি খাবারের দোকানের নাম রেখেছিল, ‘খাবি না কেন? খা’। ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনে এরশাদকে উদ্দেশ করে সরকার দলের বক্তব্য ‘করবি না কেন? কর’। এরশাদের প্রতি যতখানি ভালোবাসা সরকারি দলের, ঠিক ততখানি বিরাগ তাদের বিরোধী দলের প্রতি। অতএব এই নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা বিরোধী দলের এবং সেই প্রতিহতের কর্মসূচি দিয়ে শুরু আমাদের নতুন বছর। গত তিন দিনে যা দেখলাম তাতে এই তথাকথিত নির্বাচন প্রতিহত করতে পারবে না বিএনপি। আর প্রতিহত করার আছেই বা কি? ১৫৪ জন তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়ে গেছেন। যারা বাকি তারাও হয়তো হয়ে যাবেন। এখানে প্রতিহত করার কি আছে? বাকি যে ১৪৬ আসনের নির্বাচন হবে সেখানে কি ভোটাররা যাবেন? সারা দেশে কোথায় ভোটের বাতাস আছে? যারা ‘নির্বাচিত’ হয়ে গেছেন তারা বিব্রতবোধ করছেন। তারা এলাকার মানুষের কাছে যেতে পারছেন না। পাঁচ বছর পরে মানুষের যে একটি মাত্র অধিকার, ভোটের অধিকার তাও যে কৌশলে ছিনতাই হয়ে গেছে সেই ঘৃণা মানুষের চোখে। ৫ তারিখের ঘটনার পর যে সরকার গঠন করবে আওয়ামী লীগ তাকে কি মানুষ নিজেদের নির্বাচিত সরকার বলে ভাববে? সারা বিশ্ব? আমেরিকা থেকে শুরু করে রাশিয়া পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশই এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না কেন? আওয়ামী লীগ নেতারা যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন সবাই বোঝে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার মতো বিষয় বলে মনে করছেন না কেউ। নতুন যে সরকার হবে তাকে এসব দেশ কোন চোখে দেখবে? আমরা কি বন্ধুহীন হয়ে পড়ছি না?

বিরোধী দল বিএনপি এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। নতুন যে সরকার হবে তাকেও স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাখ্যান করবে তারা। গতানুগতিকভাবে তাই হয়। বিএনপি তো গতানুগতিকতার রাজনীতিই করছে। যদিও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া কয়েক মাস আগে একবার বলেছিলেন, তিনি নতুন ধারার সরকার (রাজনীতি) প্রতিষ্ঠা করবেন, কার্যত তার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখিনি। ফলে মানুষ কোমর বেঁধে তার পক্ষে নামেনি। মানুষ আওয়ামী লীগকে অপছন্দ করেছে কিন্তু আওয়ামী লীগের বদলে বিএনপি ক্ষমতায় বসলে যে অবস্থার গুণগত পরিবর্তন হবে তা তারা মনে করেনি। তারা মাঠে নামবে কেন? আর জনগণের কথা কি বলব, বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীকেও তো ২৯-৩০ তারিখে মাঠে দেখা যায়নি। এমনকি ২৯ তারিখে যখন বেগম জিয়াকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হলো, বাড়ির সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে দেওয়া হলো তখন বেগম জিয়া রেগেমেগে পুলিশকে গালাগাল করলেন, গোপালি বললেন। গোপালগঞ্জের নাম বদলে ফেলবেন তাও বললেন কিন্তু ঢাকা শহরে বিএনপি-ছাত্রদলের একটি মিছিলও বের হতে দেখলাম না। একটি মাত্র জায়গায় মিছিল বের করার চেষ্টা করল, তাও শিবির। একটি ছাত্র মারা গেল, সেও শিবিরের ঢাকা মহানগরের একটি অঞ্চলের সভাপতি। বোঝা যায়, আন্দোলনের মাঠে জামায়াত-শিবির যতটা আছে, বিএনপি ততটা নেই। তো এই বিএনপি লড়াইটা করবে কীভাবে? কীভাবে প্রতিহত করবে এই তথাকথিত নির্বাচন।

সৌরজগতের নিয়মে পৃথিবী নিজের অক্ষপথে ঘুরবে, দিন আসবে দিন যাবে। এমনি করে ৫ তারিখ পার হয়ে যাবে। একদিন হয়তো আওয়ামী লীগ নতুন করে সরকারও গঠন করবে যদি দৈব কিছু ঘটে না যায়। বিএনপির বন্ধুরা কিছু মনে করবেন না। আমি আপনাদের আন্দোলনের আগুনে পানি ঢালছি না। আমি বলছি আপনারা সে আগুন জ্বালাতেই পারছেন না।

আমি মনে করি, আমি যেভাবে বললাম সেভাবে যদি ঘটনা প্রবাহিত হয় তবে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। ‘দশম’ সংসদ তো আর বাতিল করা যাবে না, কথা বলতে হবে একাদশ সংসদ নিয়ে। ব্যাপারটি কষ্টের কিন্তু গণতন্ত্রের অভিযাত্রা তো ওখানেই আটকে থাকবে না। বিএনপি সে যাত্রায় থাকতে নাই পারুক অভিযাত্রা তো বন্ধ থাকতে পারে না। তখন প্রশ্ন উঠবে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ নিশ্চিত করুন, নিরাপদ করুন। না হলে এই নির্বাচনী প্রহসন, হানাহানি, মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হবে না। স্বৈরতন্ত্রের নিপাত চাই। অতএব, প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হোক। সংসদকে সংসদ সদস্যদের এবং সংসদীয় ব্যবস্থাকে অবমুক্ত করা হোক। সংবিধানকে গণতন্ত্র ও যুগোপযোগী করা হোক। বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন করা হোক এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হোক। যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলা হচ্ছে তা কেবল বড় দুটি দলের জন্য নয় কিংবা কেবল রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, দেশের ৮ কোটি ভোটারের জন্য নিশ্চিত করা হোক। নতুন বছরের এই রাজনৈতিক সংস্কারে এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা অবশ্য আছে, কিন্তু তা বলার অবকাশ আপাতত নেই।

আওয়ামী লীগ এ কাজ করবে? বিরোধিতার ভূমিকায় বিএনপি এই ইতিবাচক রাজনীতির দিকে দৃষ্টি দেবে? আমার মনে হচ্ছে না। আমি গত ২-৩ বছর ধরেই বলছি, দুই নেত্রীর হাতে দেশ নিরাপদ নয়। ২০১৩ সালের শেষে এসে সেই কথা মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করেছেন, দুজন ব্যক্তি কি সব কিছুর জন্য দায়ী? আমার জবাব প্রধানত এই দুজন বাদে বাকি যে হাজার হাজার নেতা-কর্মী এই দুই দলে আছেন, নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা প্রায় গৌণ। ২০১৪-তে এসে এই দুই নেত্রী বদলাবেন? প্রত্যাশা করতে ইচ্ছা করে কিন্তু পাঠকবৃন্দ প্রত্যাশার ফানুস উড়িয়ে স্বর্গে যাওয়া যাবে না। আমি নতুন বছরে দুই নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার সর্বাঙ্গীণ শুভ কামনা করছি। তাদের সুমতি হোক, শুভ বৃদ্ধির উদয় হোক। কিন্তু তা যদি না হয়? পাঠকবৃন্দ, তাহলে নতুন কিছু হতে হবে। হতেই হবে। না হলে আমরা বাঁচব না।

অনেকেই বলেন, এই দুটি বড় দলের বাইরে নতুন কিছু কি হতে পারে? আমি বলি পারে। যেমন দিলি্লতে পেরেছে। দিলি্লর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের স্লোগান ছিল, এই রাজনীতির চেহারা বদলাতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা আরও সত্য, এই কুৎসিত অমানবিক রাজনীতির চেহারা বদলাতেই হবে। আগের মতো বলি, দিল্লি যদি পারে ঢাকা পারবে না কেন? এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত বলার ইচ্ছা রইল।

লেখক : রাজনীতিক, আহ্বায়ক নাগরিক ঐক্য।

ই-মেইল : mrmanna51@yahoo.com

ফিরে দেখা ২০১৩