আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ ১৬৬ এবং বিএনপি সর্বোচ্চ ১৩৭টি আসন পেতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত।

‘এই সম্ভাব্য ফলাফল সঠিক হলে আওয়ামী লীগের জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে জোট হতে পারে জাতীয় পার্টির সঙ্গে। বিএনপির পক্ষে এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেই। তবে বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা যতটুকু আছে, তা যথেষ্ট শর্তসাপেক্ষ।’

আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত এক সেমিনারে একটি গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশকালে এ তথ্য প্রকাশ করেন ড. আবুল বারকাত।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের প্রতিটি নির্বাচন বিশ্লেষণ করেছেন এই অর্থনীতিবিদ। একইসঙ্গে কথা বলেছেন ভোটারদের সঙ্গেও। এসবের আলোকে তিনি একা পরিচালনা করেছেন ‘ভোটারের মন ও আসন্ন ২০২৪ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল’ শীর্ষক গবেষণা।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে ড. আবুল বারকাত জানান, গত প্রায় ছয় মাস যাবৎ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা সম্পন্ন করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমার এই গবেষণার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকে ভাবতে পারেন, সামনে দেশে যা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে তার সঙ্গে হয়তো এই গবেষণা ফলাফল প্রকাশের সম্পর্ক আছে। তাদের নিশ্চিত করতে চাই, বিষয়টি এমন নয়। একেবারে ব্যক্তি আগ্রহ থেকে ছয় মাস আগে আমি এই গবেষণা শুরু করেছিলাম।’

গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করে ড. বারকাত বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল, প্রার্থী ও ভোটারের জন্য নির্বাচনী মাঠ সমান হলে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৪৮ থেকে ১৬৬টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১১৯ থেকে ১৩৭টি এবং অন্যান্য দল ১৫টি আসন পেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৫টি আসনের ভাগ্য মোটামুটি নির্ধারিত। এগুলো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভিত্তি আসন। এই ১৫৫টি ভিত্তি আসনের মধ্যে ৭০টি পেতে পারে আওয়ামী লীগ, ৭০টি বিএনপি এবং বাকি ১৫টি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এলডিপি ও বিজেপি পেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে বড় দুই দলের মধ্যে যেকোনো দলকে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বাকি ৮১টি আসন পেতে হলে দোদুল্যমান ভোটারদের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং যেকোনো আসনে জিততে হলে দোদুল্যমান ভোটারদের ৫৬ শতাংশ ভোট পেতে হবে।’

গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৫টি ভিত্তি আসনের বাইরে থাকা ১৪৫টি আসনই নির্ধারণ করবে যে কোন দল সরকার গঠন করবে। ভিত্তি আসনে দোদুল্যমান ভোটারদের ভূমিকা থাকবে কম। তবে, বাকি ১৪৫টি আসনে ভাগ্য নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা থাকবে দোদুল্যমান ভোটারদের।

ড. বারকাত দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, এই ১৪৫টি আসনের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও বয়সের ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করে তিনি দোদুল্যমান ভোটারদের চিন্তা বোঝার চেষ্টা করেছেন।

সেই আলোকে তার গবেষণায় উঠে এসেছে, এই ১৪৫টি বিজয় অনিশ্চিত আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭৮ থেকে ৯৬টি আসন এবং বিএনপি ৪৯ থেকে ৬৭টি আসন পেতে পারে।

আসন্ন নির্বাচনে দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ভোটারদের মাঝে পদ্মা সেতু একটি বড় নিয়ামক হতে পারে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই অঞ্চলের ২৩টি বিজয় অনিশ্চিত আসনের সবগুলো আওয়ামী লীগ পেতে পারে।

এ ছাড়া, ঢাকাসহ দেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের ১২২টি বিজয় অনিশ্চিত আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৫ থেকে ৭৩টি এবং বিএনপি ৪৯ থেকে ৬৭টি আসন পেতে পারে বলে উঠে এসেছে এই গবেষণায়।

ড. বারকাত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই গবেষণার জন্য এ যাবৎ হওয়া সবগুলো নির্বাচনের প্রার্থীদের তালিকা আমি বিশ্লেষণ করেছি। এই সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন সেটা বের করেছি।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী কত সৎ তার কোনো সম্পর্ক নেই। ভোটাররা চিন্তা করেন কোনো বিপদে পড়লে কার কাছে গিয়ে সহযোগিতা পেতে পারেন, তাকেই তারা ভোট দিতে চান।’

তার ভাষ্য, ‘দোদুল্যমান ভোটাররা ভোট দেওয়ার সময় অর্থপাচার থেকে শুরু করে এত বড় বড় বিষয় নিয়ে ভাবেন না। তাদের কাছে গুরুত্ব পায় দ্রব্যমূল্য, মানব নিরাপত্তা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়। এবার এর সঙ্গে পদ্মা সেতু, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং স্যাংশন‑নিষেধাজ্ঞা‑ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের যুদ্ধ একটি অবজেক্টিভ ফ্যাক্টর ও সংশ্লিষ্ট কাউন্টার‑ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।’

‘একই সঙ্গে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে আত্মীয়তা, বন্ধুবান্ধব, ঘনিষ্ঠজন, মুরুব্বিদের উপদেশ‑আদেশ‑নির্দেশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিকতা সাবজেক্টিভ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে,’ যোগ করেন তিনি।

অধ্যাপক আবুল বারকাত জানান, ভোটারের সম্ভাব্য দলীয় আনুগত্য অবস্থা, ভিত্তি ভোট বা দলীয় অনুগত ভোটারের ভোটের ধারণা, ভিত্তি আসনের ধারণা, বিজয় অনিশ্চিত আসনের ধারণা, দোদুল্যমান ভোট, দোদুল্যমান ভোটারদের ভোট প্রদান সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের ফ্যাক্টর-কাউন্টার ফ্যাক্টর এবং এসবের সম্ভাব্য প্রভাব ও গতিমুখ, ভোটারদের ভৌগলিক অবস্থান বিভাজন (পদ্মা সেতুর প্রভাব অঞ্চল এবং তার বাইরের অঞ্চল) ব্যাখ্যা‑বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ খোলামেলা আলাপ‑আলোচনার ভিত্তিতে এই গবেষণা করা হয়েছে।

ড. বারকাত বলেন, ‘এই সম্ভাব্য ফলাফল সঠিক হলে আওয়ামী লীগের জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে জোট হতে পারে জাতীয় পার্টির সঙ্গে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষে এককভাবেও সরকার গঠন সম্ভব হতে পারে, যদি তারা সর্বোচ্চ সংখ্যক সম্ভাব্য আসন পায়।’

তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য চূড়ান্ত ফলাফল বহাল থাকলে বিএনপির পক্ষে এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেই। তবে বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা যতটুকু আছে, তা যথেষ্ট শর্তসাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে অবশ্যই সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন নিশ্চিত করতে হবে এবং জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বাকি সব দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে এই সমীকরণের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা কোনো অবস্থাতেই সম্ভাব্য সর্বনিম্ন সংখ্যক আসনের বেশি হতে পারবে না। এত বেশি শর্তসাপেক্ষ বিধায় বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আরও বলেন, ‘সম্ভাব্য এই হিসাব কতটা সঠিক বা ভুল তা বুঝতে তিনটি বড় মাপের চলকের—ভিত্তি ভোট, ভিত্তি আসন ও দোদুল্যমান ভোটারদের ভোট প্রদান সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য কাঠামো—সম্ভাব্য মান যৌক্তিকভাবে পরিবর্তন করে দেখা গেছে যে, তাতে করে দলভিত্তিক আসন বণ্টনে এমন কোনো হেরফের হয় না, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হতে পারে। সুতরাং, আসন্ন ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য আসনসংখ্যার যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, তা যথেষ্ট মাত্রায় সঠিক এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী ফলাফল সংশ্লিষ্ট গৃহীত পদ্ধতিতত্ত্ব যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত।’