বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার ভিসা সংখ্যায় হঠাৎ লাফ

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার বিষয়টি তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির ভিসানীতি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে।

ওয়াসেক বিল্লাহমাসুম বিল্লাহবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়া মানুষের সংখ্যা চলতি বছর হঠাৎ করেই লাফ দিয়েছে।

কোভিড মহামারীর দুই বছর বাদ দিলে ২০১৩ সাল থেকে এক দশক এ সংখ্যা মোটামুটি একটি বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে চলতি ২০২২-২৩ সালের সংখ্যাটি এরই মধ্যে ৫৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে বছর শেষে সংখ্যাটি ৬০ হাজারের বেশি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যুরো অব কনস্যুলার অ্যাফেয়ার্সের পরিসংখ্যানে মিলেছে এমন তথ্য।

ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে সংখ্যাটি কেবল ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে ইস্যু করা ভিসার; ‍অন্যান্য কেন্দ্র থেকে ইস্যু করা ভিসা হিসাবের বাইরে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবছর হিসাব হয় অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তাদের ভিসার হিসাবও সেই সূচি ধরেই করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার বিষয়টি তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির ভিসানীতি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে যারাই বাধা হবে তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেবে না দেশটি। এরই মধ্যে এই নীতির প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে।

তবে কাকে ভিসা দেওয়া হচ্ছে না, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের গোপন দলিল। ভিসাপ্রত্যাশী ছাড়া অন্য কাউকে সেই তথ্য জানানো হয় না।

বাংলাদেশ থেকে কতটি ভিসা দেওয়া হয়েছে, এই তথ্য প্রকাশ করা হলেও কতটি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, সেটি প্রকাশ করা হয়নি।

আবার যাদের ভিসা আবেদন ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাদেরকেও প্রত্যাখ্যানের কারণ জানানো হয় না। কখনও কখনও রিভিউয়ের জন্য বাড়তি কাগজপত্র চাওয়া হলেও সেই রিভিউ প্রক্রিয়ায় কত দিন লাগতে পারে, জানানো হয় না সেটাও।

কোন বছর কত ভিসা

২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশিদের জন্য ২ লাখ ২৫ হাজার ৭১৫টি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ঢাকায় দূতাবাস থেকে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৪৬০টি।

গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় যাওয়ার অনুমতিপত্র বা ভিসা দেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ২৫৪ জনকে। এর আগে কোনো বছর এত বেশি ভিসা দেওয়া হয়নি বাংলাদেশ থেকে।

এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৬৭৪ জনকে দেওয়া দেওয়া হয়েছে নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা। শিক্ষা, ভ্রমণ, ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানা কারণে এই ভিসা দেওয়া হয়। আর ১৪ হাজার ৫৮০ জনকে দেওয়া হয়েছে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা। এই ভিসা পেলে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যায়।

এর আগের এক দশকে ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের বছরে ৪৬ হাজার ৯২৩টি ভিসা দেওয়া হয় বাংলাদেশিদের, যা এতদিন সর্বোচ্চ ছিল।

ওই বছর ৩৫ হাজার ২৫ জন বাংলাদেশিকে দেওয়া হয় নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পান ১১ হাজার ৮৯৮ জন।

নির্বাচনের আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা পান মোট ৩৮ হাজার ৬৪৮ জন। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৮০টি ছিল নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, আর ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ছিল ১০ হাজার ৫৬৮টি।

তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের তিন বছর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৭ সালে ঢাকা থেকে ভিসা কমে হয় ২৭ হাজার ২৬৫টি। এর মধ্যে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ছিল ১২ হাজার ৭৬৬টি; আর নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ছিল ১৪ হাজার ৫৯৯টি।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের বছরে ভিসার সংখ্যা আবার ছাড়ায় ৩৮ হাজার। ওই বছর সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ১৭৯টি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়া হয়্; নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ছিল ২৩ হাজার ২৫০টি।

নির্বাচনের পরর বছর ২০১৯ সালে নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বেড়ে হয় ৩০ হাজার ৫০৫টি। তবে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা কমে হয় ১২ হাজার ৫৭৩টি। অর্থাৎ দুই ধরন মিলিয়ে ভিসা দেওয়া হয় ৪৩ হাজার ৭৮টি।

এরপর ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারীর বছরে তা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে আসে। ওই বছর নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়া হয় ১২ হাজার ৩৯টি, ইমিগ্র্যান্ট ভিসা কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ১৬২টি।

২০২১ সালে নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা কিছুটা বেড়ে হয় ১৩ হাজার ৭৬৪টি, তবে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩১১টি। অর্থাৎ ওই বছর মোট ভিসা দেওয়া হয় ১৯ হাজার ৭৫টি।

মহামারীর অবসানের পর ২০২২ সালে ঢাকার আমেরিকা দূতাবাস ভিসা ইস্যু করে ৩৮ হাজার ২৭৬টি। এর মধ্যে ২৯ হাজার ২০২টি ছিল নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, বাকি ৯ হাজার ৭৪টি দেওয়া হয় ইমিগ্র্যান্ট ভিসা।

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিকে ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ হিসাবে বর্ণনা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “গত পাঁচ বছরে কী পরিমাণ বাংলাদেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন সেই ডেটা বলে যে, কোভিডের সময়ের নিষেধাজ্ঞার ফলে কমে এলেও, এ বছরের অগাস্টের শেষ দিন পর্যন্ত অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যক মানুষ সফর করেছেন।”

মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন বাড়ার কারণে যাতায়াত বাড়ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বিদেশে যাওয়া যেন সহজতর হয়, সে কাজগুলো আমরা করছি। তারই ধারাবাহিকতায় এটি সম্ভব হয়েছে এবং মানুষের প্রয়োজনও বেড়েছে, সেটা লেখাপড়ার জন্য হোক, ব্যবসার জন্য হোক এবং অন্যান্য কাজে হোক। এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”

আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ কী?

বাংলাদেশের সফটওয়্যার ডেভেলপার আল ফারুক শুভ যান্ত্রিক নামে একটি স্টার্টআপ কোম্পানির উদ্যোক্তা। সিঙ্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি দেশে তার কোম্পানিটি স্টার্টআপ মেলা বা এ সংক্রান্ত আয়োজনে অংশ নিয়েছে।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি আয়োজনে অংশ নিতে চাইলেও পারেননি শুভ। কারণ, তার ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ঢাকার দূতাবাস।

কেন আবেদনটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল- এই প্রশ্নে শুভ বলেন, “ওরা এই কারণ কখনও বলে না। আমাকেও বলেনি।”

২০১৪ সালে ট্যুরিস্ট ভিসায় মাস ছয়েক যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়ে আসা সংবাদ কর্মী মেহরীন জাহান গত জানুয়ারিতে আবার একই ভিসায় আবেদন করলেও এখনও তা চূড়ান্ত হয়নি।

আবেদন করার পর জানুয়ারিতেই তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেদিন তাকে আরও কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয় একটি থার্ড পার্টি এজেন্সির কাছে। জানানো হয়, এরপর তার আবেদনটি রিভিউ করা হবে।

দূতাবাস থেকে চাওয়া সব কাগজপত্র এক সপ্তাহের মধ্যে জমা দিয়ে আসেন মেহরীন। কিন্তু রিভিউ শেষ হয়েছে কি না, কবে শেষ হবে, এর কিছুই তিনি জানতে পারেননি প্রায় নয় মাসেও।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই সংবাদকর্মী বলেন, “এমনকি আমার কাগজপত্র পেয়েছে কি না, সেই নোটিফিকেশনও আমার কাছে আসেনি। ড্যাশবোর্ডেও কোনো আপডেট নাই। আমি যতবার কল করেছি, ওখানকার কর্মীরা বলেছে, এই প্রক্রিয়াটা একটু দীর্ঘমেয়াদী হয়। তবে কত দিন লাগবে, সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয় না।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজে ভিসা আবেদনকারীদের প্রশ্নের জবাব দিতে যে ‘ভিসা চ্যাট’ করা হয়, সেখানেও মেহরীন তার আবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন রাখেন। সেখানে তাকে যে জবাব দেওয়া হয়েছে, তাতে নতুন কোনো বার্তা ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা আবেদনকারীদের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনতে ‘সুপার ফ্রাইডে’ নামে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল দেশটির দূতাবাস। এবছর জুলাই পর্যন্ত এমন ১৬টি শুক্রবারে ৬ হাজার নন-ইমিগ্র্যান্ট এবং ২ হাজার ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল।