‘অনেস্ট সেন্টার ও ক্যাফে’ মূলত একটি রেস্টুরেন্ট। কিন্তু আর পাঁচটি রেস্টুরেন্টের মতো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এটি চালু করা হয়নি। অনেস্ট ক্যাফের একপাশে সুপার শপ, অন্যদিকে সারি সারি বইয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে লাইব্রেরি। কিন্তু কোনোটি ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে নয়। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। অনেস্ট ক্যাফে নিজেরা লাভ করে না, উল্টো ক্রেতাকেই লাভের অংশ দেয়।

‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুইবিঘা জমি’ কবিতার এই লাইনটি আমাদের সমাজের চিরাচরিত এক দৃশ্য। কিন্তু স্রোতের বিপরীতে যেমন হাওয়া বয়ে চলে, তেমনি সমাজের এক শ্রেণির মানুষের ধর্ম হচ্ছে অন্যদের জন্যে কাজ করে যাওয়া। কিন্তু ব্যবসায়িক কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন চিত্র কল্পনা করা যায় না। আর ঠিক ব্যতিক্রমধর্মী এমনই এক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে চট্টগ্রাম শহরে।

‘অনেস্ট সেন্টার ও ক্যাফে’ মূলত একটি রেস্টুরেন্ট। কিন্তু আর পাঁচটি রেস্টুরেন্টের মতো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এটি চালু করা হয়নি। অনেস্ট ক্যাফের একপাশে সুপার শপ, অন্যদিকে সারি সারি বইয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে লাইব্রেরি। কিন্তু কোনোটি ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে নয়। হ্যাঁ, শুনে অবাক হওয়ার মতো হলেও চট্টগ্রাম শহরের জামালখান রোডের সিপিডিএল ম্যাজেস্টায় এমনই দৃশ্য দেখা যায়।

ভাবনার শুরু

‘পে ইট ফরোয়ার্ড’ নামের একটি সংস্থা ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ‘আসুন মায়া ছড়াই’—এই বাণীকে সামনে রেখে সামাজিক এই সংস্থাটি হতদরিদ্র, দুস্থ ও অসচ্ছল মানুষের নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করে চলেছে। প্রতি মাসে হাজারের অধিক অসচ্ছল শিক্ষার্থীর পড়াশোনার জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করে থাকে সংস্থাটি। ‘পে ইট ফরোয়ার্ড’ বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের জন্যে ‘হ্যাপী লাউঞ্জ’ নামের নির্ধারিত একটি স্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এটি কোনো বৃদ্ধাশ্রম নয়, এখানে এসে বয়স্ক লোকজন একে অপরের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করেন। তাদের একাকিত্ব দূর করার জন্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া। এছাড়াও এই সংস্থা থেকে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার তৈরির জন্যে নানারকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সরকারি এক কর্মকর্তার হাত ধরে এই সংস্থা চালু হলেও এর যাবতীয় দেখভাল ও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে একদল স্বেচ্ছাসেবক তরুণ-তরুণীরা।

‘পে ইট ফরোয়ার্ড’ সংস্থা থেকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ দিতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা লক্ষ করলেন, তাদের পক্ষে এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই ভিন্ন কিছু করার চিন্তা করলেন। যেন শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের পড়াশোনার জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জন ও সংগ্রহ করতে পারে। সেখান থেকে যাত্রা শুরু ‘অনেস্ট’এর। এক এক করে শিক্ষার্থীবান্ধব নতুন মডেল গড়ে তোলা হয় ‘অনেস্টে’র ছাদতলে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে সুপার শপ ও একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়। অনলাইন এই প্ল্যাটফর্মটিতে তরুণ উদ্যোক্তারা নিজেদের পণ্যের ধারাবিবরণী উল্লেখ করে পোস্ট করেন। ২০২০ সালে ‘অনেস্ট ক্যাফে’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলা হয় শিক্ষার্থীদের জন্যে। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।

‘অনেস্টের’ অপারেশন সাইট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা মোঃ এনামুল হক জানান, ‘মানবতার তরে কাজ করতে আমাদের সবচেয়ে বড় জায়গাটি হচ্ছে বিশ্বাস ও সততা। সবাই এখানে স্বচ্ছতা বজায় রেখে যাবতীয় কাজ ও সেবা নিয়ে থাকে। তাই আমাদের এই প্রতিষ্ঠান ও প্রজেক্টগুলোর নাম “Honest” রাখা হয়েছে। আমরা ব্যক্তিদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। বর্তমানে অনলাইন “অনেস্ট” প্ল্যাটফর্মটিতে ১ লক্ষ ৩৬ হাজারের ওপর সদস্য রয়েছে। করোনাকালে মানুষ চাকরি হারাতে শুরু করলে অনেকে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটেন। এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনলাইনে নানারকম পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাদের মধ্যে অনেকের অবিক্রীত পণ্য রয়ে গেছে, অনেকে আবার চাকরি শুরু করেছেন। তাদের সেই পণ্য বিক্রি করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে অনেস্ট। আমাদের এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সেসব পণ্য বিক্রির সম্পূর্ণ অর্থ উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর জন্য কোনো রকম চার্জ নেওয়া হয় না। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই-এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো।’

অনেস্টে’ ক্রেতা যারা মালিক তারাই

আপনি একটি দোকানে গিয়ে পণ্য কিনলেন এবং দোকানের বিক্রেতা সেই পণ্য সমেত টাকা আবার আপনাকেই ফেরত দিচ্ছেন। ভাবছেন, এটা কীভাবে সম্ভব! হ্যাঁ, নতুন এই বিজনেস মডেল উদ্ভাবন করেছে ‘অনেস্ট প্ল্যাটফর্ম’। তরুণরা যেন কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই আয় করতে পারে, সেজন্যেই এই অভিনব পন্থা। অর্থাৎ বাইরে থেকে পণ্য না কিনে অনেস্টের প্ল্যাটফর্ম ও সুপার শপ থেকে পণ্য কিনলে ক্রয়কৃত পণ্যের সঙ্গে লাভের একটা অংশ ক্রেতাদের ফেরত দেওয়া হয়। অনেকের কাছে মনে হতে পারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রেখে তারপর সেখান থেকে লাভের একটা অংশ দেওয়া হবে। কিন্তু এখানেও ‘অনেস্ট’ তার সততা ধরে রেখেছে। অন্যান্য দোকানের চেয়ে মূল্যে ‘অনেস্ট’ তাদের সব পণ্য বিক্রি করে।

এই বিষয়টি বিশদভাবে বোঝাতে গিয়ে এনামুল হক বলেন, ‘অন্যান্য জায়গায় দোকান ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচা বাবদ লাভের কথা মাথায় রেখে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি অর্থ ধার্য করে থাকেন। আমাদের এখানে ১০০ টাকার পণ্য ১২৫ টাকা বিক্রি করা হলে সেখান থেকে ৬০ শতাংশ টাকা ক্রেতাদের ফেরত দেওয়া হয়। তাহলে পণ্যটির দাম দাঁড়ায় ১১০ টাকা। এই ১১০ টাকা থেকে লাভের ১০ টাকার ৬ টাকা চলে যায় অনুদান হিসেবে এবং বাকি ৪ টাকা ব্যবসার আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় করা হয়। অর্থাৎ এখানে লাভের টাকার ভাগীদার কোনো ব্যক্তি হয় না।’

‘অনেস্ট’ ক্যাফে চালু করার পেছনেও রয়েছে এমন এক গল্প। শিক্ষার্থীরা যেখানে নিত্যপ্রয়োজন ও পড়াশোনার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে একবেলা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভালো খাবার খাওয়া তাদের জন্যে স্বপ্নবিলাসের মতো। তাই তাদের কথা মাথায় রেখে দুবছর আগে ‘অনেস্ট ক্যাফে’ চালু করা হয়। ক্যাফেটি চালু হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে এখানে। রেস্তোরাঁর এই জায়গাটি একজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে দান করেছেন। তাই ভাড়া বাবদ অর্থের বোঝা স্বেচ্ছাসেবকদের টানতে হয় না। স্বল্পমূল্যে এখানে পাওয়া যায় কফি, সুপ, নুডলসসহ হালকা নাস্তা আইটেম। শিক্ষার্থীদের বাইরেও নানা প্রান্তের লোক ভিড় জমাচ্ছেন ভিন্নধর্মী এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্বচক্ষে দেখার জন্যে। সবার কথা মাথায় রেখে রেস্তোরাঁর এককোণে কয়েকশ বইয়ের স্তূপে সাজানো হয়েছে লাইব্রেরি। লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ার জন্যে কোনো অর্থ প্রদান বা কার্ড করার ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। ক্যাফের দেয়ালে লিখে রাখা হয়েছে—’আড্ডা নয়, বই পড়ুন অনেস্ট ক্যাফেতে’।

‘রেস্তোরাঁয় রান্না থেকে পরিচালনার যাবতীয় কাজ শিক্ষার্থীরা করে। পড়াশোনার পাশাপাশি ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত অনেস্ট ক্যাফেতে খণ্ডকালীন কাজ করছেন। ১৫ জনের বাইরে আরও ৬-৭ জন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। কোনো যখন শিক্ষার্থী বিশেষ প্রয়োজনে ছুটিতে থাকেন, তখন এই স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজ দায়িত্বে হাজির হয়ে যান ক্যাফে পরিচালনার ভার নিতে। খণ্ডকালীন কাজ করা এই শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতখরচা বাবদ কিছু অর্থ প্রতি মাসে পেয়ে থাকেন। যেটি তারা নিজেদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে কাজে লাগান। এখানে কাজ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মহানুভবতা এত বেশি, যার জন্যে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে অনেস্ট বলে সম্বোবধন করা যায়। সেভ ফরোয়ার্ড বাংলাদেশ প্রজেক্ট থেকে প্রতি মাসে ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হয়। অনেস্ট ক্যাফেতে কাজ করার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজ থেকে এসে জানায়, তাদের আর বৃত্তির প্রয়োজন নেই। যেসব শিক্ষার্থী আর্থিকভাবে অসচ্ছল তাদের মাঝে বৃত্তির টাকা প্রদান করে দেওয়ার জন্যে,’ এনামুল হক বলেন।

আপনার কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানান

ভিন্ন ভিন্ন নামে কয়েকটি প্রকল্প পরিচালনা করে স্বেচ্ছাসেবক এই দল। ‘ডোনেট ইট ফরোয়ার্ড’ নামের প্রকল্পটিতে বিনামূল্যে মানুষকে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা দেওয়া হয়। সম্প্রতি এই প্রকল্পের আওতায় সিলেট ও নেত্রকোনায় বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ১ হাজার ৭০০ প্যাকেট খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হয়। করোনাকালীন এই স্বেচ্ছাসেবক দল সরকারের অনুমতি নিয়ে চীন থেকে সিলিন্ডার এনে জেলা শহরের মেডিকেলগুলোতে বিনামূল্যে সেবা দেয়। ক্যাফের দেয়ালেও লিখে রাখা হয়েছে—’সামর্থ্য না থাকলে, আপনি নিয়ে যেতে পারেন সম্পূর্ণ ফ্রিতে’। প্রয়োজন অনুযায়ী যে-কেউ চাইলে এখান থেকে নেবুলাইজার, অক্সিজেন সিলিন্ডার, মেডিকেল বেড, হুইল চেয়ার থেকে শুরু করে চিকিৎসার অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস, খাবার, জামাকাপড় নিতে পারেন। আবার অতিরিক্ত থাকলে মানুষ যেন এখানে দিয়ে যায়, তার জন্যে উৎসাহিত করা হয়। বর্তমানে এই প্রকল্পের আওতায় জেলা-উপজেলার মেডিকেলগুলোতে ১ হাজার ৭৩৫ টি সিলিন্ডার রাখা হয়েছে।

সমাজ সেবায় কাজ করে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবকের লক্ষ্য দেশের সর্বস্তরের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। বর্তমানে ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব থেকে একদিন সেটা ১৭ লাখে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে। ‘আসুন মায়া ছড়াই’—এই বাণী যেন প্রতিটি মানুষের ধর্ম হয়ে ওঠে এবং মানুষ মানুষের সেবায় হাত বাড়িয়ে দেয়, এই প্রত্যাশায় কাজ করে যাচ্ছেন একদল তরুণ।

সূত্র: টিবিএস