দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ মুছে ফেলেছে ব্যাংকগুলো চলতি বছরের ২য় প্রান্তিকে

৩ বছর হলেই অবলোপন

|সাইফুল্লাহ আমান, ঢাকা টাইমস|

মাত্র তিন মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

কৃত্রিমভাবে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া সুবিধা ব্যবহার করে ঋণের তথ্য ব্যালান্স শিট থেকে মুছে ফেলছে ব্যাংক সমূহ। এপ্রিল থেকে জুন এ তিন মাসে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক হালানাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করেছে ৭ হাজার ৩১৯ কোটি টাকার। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঋণ অবলোপন হয়েছে ১ হাজার ৯৬১ কোটি টাকার। এর ফলে ব্যাংকখাতে সর্বমোট অবলোপন দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। যা ঋণ অবলোপনের রেকর্ড।

কাগজ-কলমে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে ঋণ অবলোপন করে ব্যাংক। দীর্ঘদিন অনাদায়ী গ্রাহকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যালেন্স শিট থেকে মুক্ত করতে ঋণ অবলোপনের পথে ঝুঁকছে সবগুলো ব্যাংক।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, নিয়মানুযায়ী ব্যাংকগুলোর অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। তবে খেলাপির নানা শ্রেণিভেদে ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্স শিটকে খেলাপির ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখতে অবলোপনের পথ বেছে নেয়। ফলে ৩ বছরের বেশি ঋণ যা মন্দ মানে রয়েছে, সে ঋণগুলোকে অবলোপন করে। সেক্ষেত্রে তাদের আয়ের টাকা দিয়ে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। তবে কিছু ব্যাংক মর্টগেজ বা বন্ধকি সম্পত্তিকে পুনরায় অ্যাসেসমেন্ট করে কিছু সুযোগের আশ্রয় নেয়।’

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলোকে ঋণ অবলোপনের সুযোগ করে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সুযোগ তখন থেকেই ব্যাংকগুলো ব্যবহার করে আসছে। যদিও শুরুতে নিয়ম ছিল ৫ বছরের বেশি যে মন্দ ঋণগুলো আদায় করা যাচ্ছে না, সেগুলো ঋণ অবলোপন করা যেত। কিন্তু এখন তা ৩ বছর হলেই অবলোপন করা যায়। সাধারণত খেলাপি হওয়ার পর যে ঋণ আদায় করার সম্ভাবনা খুবই কম, সে ঋণ অবলোপন করে ব্যাংকগুলো। তবে এই ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করা যায় না।

অন্যদিকে অতিসম্প্রতি খেলাপি ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে নীতিমালায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আগে মামলা ছাড়া সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবলোপন করা যেত। আর এখন ২ লাখ টাকা পর্যন্ত মামলা ছাড়াই মন্দঋণ অবলোপন করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নীতিমালা শিথিল করার কারণে খেলাপি ঋণগুলোর অবলোপনের হার বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো।

গত এক দশকে ঋণ বিতরণে নানা অনিয়মের ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যাধিক হারে বেড়ে যায়। এ কারণে ২০১৯ সালে বিশেষ নীতিমালার আওতায় ১০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ৫০০ কোটি টাকার কম এমন ঋণে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয় সরকার। কিন্তু ২০২০ সালে কোভিডের আঘাতের ফলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি বিবেচনায় কয়েক দফায় সুযোগ বাড়ায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে কোভিডের প্রথম বছর ২০২০ সালে কেউ ঋণের ১ টাকা পরিশোধ না করলেও কাউকে খেলাপি দেখাতে পারেনি ব্যাংকগুলো। এরপর ২০২১ সালে এ সুযোগ কিছুটা কমিয়ে কিস্তির ২৫ শতাংশ পরিশোধ করলেই খেলাপি না দেখাতে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। নতুন করে আর কোনো সুযোগ বাড়ানো হয়নি। যদিও ব্যবসায়ী নেতা এবং সংগঠনগুলো নতুন করে এ সুবিধা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করছে। তবে এ সুবিধা নতুন করে না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও ঋণখেলাপির হার কমাতে পারেনি ব্যাংকগুলো। গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের অনীহার কারণেই খেলাপি বেড়েছে বলে অভিমত ব্যাংককর্তাদের। তাই ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকেও আর কোনো সুযোগ না দেওয়ার আবেদন রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘খেলাপি যারা তাদের বেশিরভাগই প্রভাবশালী। সুযোগ-সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা লোন পরিশোধ করে না। বিভিন্ন সুযোগ দেওয়ায় এ বছর ঋণ অবলোপনের হার কম। নয়তো এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কয়েকগুণ হতো।’

অন্যদিকে ২০১৫ সালে বড় ঋণগ্রহীতাদের দেওয়া ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের জন্য ফের সুযোগ চাওয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করে দেয়।

এ বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘অর্থঋণ আদালতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মামলা হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত থাকায় বছরের পর বছর নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এ ছাড়াও চলমান মামলার বিচারকাজ অযৌক্তিকভাবে মুলতবি রাখা হয়। বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে যে মামলাগুলো স্থগিত রয়েছে, সেগুলো স্থগিতাদেশ বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এজন্য উদ্যোগ নিতে হবে। স্থগিত মামলাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে দিতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাপ করে এসব স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।’

এ ছাড়াও অর্থঋণের আদালত ও বিচারক বৃদ্ধি এবং দক্ষ বিচারক দিয়ে এসব মামলার বিচার পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে বলে উল্লেখ করেন অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম।

 এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঋণ অবলোপনের নীতিমালা করা হয়েছিল ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণকে সহজে আদায়ের জন্য। তবে অর্থঋণ আদালতের নানা দীর্ঘসূত্রতার কারণে এভাবে আদায় খুবই শ্লথগতিতে হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে দায়িত্ব নিতে হবে।’

এ ছাড়া শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকই নয়, রাষ্ট্রের সবগুলো সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন সালেহ উদ্দিন আহমেদ।