দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে সরকার উৎখাতে আন্দোলনকারীদের ভূমিকা থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আপনার কী মনে হয় না, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সরকার উৎখাতে আন্দোলনকারী যারা তাদেরও কিছু কারসাজি আছে?

মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, যারা পণ্য মজুত করে দাম বাড়ায় তাদের গণধোলাই দেওয়া উচিত।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গণভবনে এই সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। সম্প্রতি জার্মানির মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতেই প্রধানমন্ত্রীর এই সংবাদ সম্মেলন।

দ্রব্যমূল্য, অবৈধ মজুতদারি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৫ বছর ধরে যে পরিবর্তন এসেছে, তা তো স্বীকার করবেন। ভাতের জন্য হাহাকার ছিল। একটু নুন–ভাত। একটু ফ্যান চাইত। এখন তা চায় না। ডিম লুকিয়ে রেখে দাম বাড়ানো। আপনার কী মনে হয় না, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সরকার উৎখাতে আন্দোলনকারীদের তাদেরও কিছু কারসাজি আছে?’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘এর আগে পেঁয়াজের খুব অভাব। দেখা গেল বস্তার পর বস্তা পচা পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছে। এই লোকগুলোর কী করা উচিত, আপনারাই বলুন কী করা উচিত। তাদের গণধোলাই দেওয়া উচিত। জিনিস লুকিয়ে রেখে পচিয়ে ফেলে দেবে, আর দাম বাড়াবে।’

মানুষের চাহিদা বৃদ্ধিও দাম বাড়ার একটি কারণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। আর উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদাও বেড়েছে।

সরকারবিরোধী তৎপরতার কথা উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলনে, ‘জাতির পিতাকেও ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে। দেশে নির্বাচন যাতে না হয়, সে ষড়যন্ত্রও ছিল।’ দেশে নির্বাচন বানচাল করতে না পেরে এখন দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলে সরকার উৎখাত করার ষড়যন্ত্র চলমান আছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ইউরোপীয় প্রতিটি দেশের সঙ্গে আমাদের যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আছে, সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও আছে। যে কারণে এবারের ইলেকশন নিয়ে তারা কোনো কথা বলেনি। তারা জানতো নির্বাচনে আমিই জিতে আসব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সাথে আমাদের ভালো একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। ফ্রান্স আমাদের এক বিলিয়ন ইউরো দেবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য। এখন আমরা যেসব প্রজেক্ট করব, সেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেন হয়, তাহলে আমরা এসব অর্থায়ন কাজে লাগাতে পারব।

পাকিস্তানের নির্বাচন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, একটি দেশে নির্বাচনের রেজাল্ট ডিক্লেয়ার করতে ১২/১৪ দিন সময় লাগলেও তাদের ইলেকশন ফ্রি-ফেয়ার। আর বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সাথে সাথে মাত্র ২৪/৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজাল্ট এসে গেল, সেটি ফ্রি-ফেয়ার না? সুতরাং এই রোগের কোনো ওষুধ আমাদের হাতে নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। আমার কাছে ক্ষমতা হলো থাকে লক্ষ্মী যায় বালাই প্রবাদের মতো। আমার কোনো চিন্তা নেই। ক্ষমতায় থাকলে ভালো যে, আমি দেশের জন্য কাজ করতে পারছি। আর না থাকলেও আমার কোনো আফসোস নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার লক্ষ্য ছিল— ২০২১ সাল পর্যন্ত থাকতে হবে, বাংলাদেশকে একটা ধাপ ওপরে তুলতে হবে, আমি সেটা করে দিয়েছি। এখন আমার একমাত্র নির্ভরতা হলো আমার দেশের জনগণ। সবসময় চেয়েছি জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে কাজ করার।

ফিলিস্তিন যুদ্ধ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সবসময় স্পষ্ট করে বলি আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা শান্তি চাই। কারণ যুদ্ধকালীন যে কষ্ট, আমরা তার ভুক্তভোগী। আমি নিজেই একজন ভুক্তভোগী। আমার দেশের মানুষ যেভাবে গণহত্যার শিকার হয়েছে, আমরা তা দেখেছি।

তিনি বলেন, আমি মিউনিখ সম্মেলনেও বলেছি— গাজায় যেটা হচ্ছে সেটা অমানবিক কাজ। হাসপাতালে আক্রমণ, হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে মানুষকে মারা। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে সেখানকার বাচ্চাদের দুরবস্থা দেখে। এটা কি মানবতাবিরোধী নয়? অবশ্যই মানবতাবিরোধী।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ব মোড়লরা দুইমুখো নীতিতে বিশ্বাস করে। একদিকে ফিলিস্তিনের সমস্ত জমি দখল করে ফেলছে, এটা কোনো বিষয় নয়, আবার ইউক্রেনেরটা বিষয়। এই দু-মুখো নীতি কেন হবে, সেটাই আমার প্রশ্ন ছিল।

ট্রাফিক লাইট সিস্টেমটাকে ভালোভাবে চালু করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, আমি গতকাল আইজিপির সঙ্গে কথা বলেছি— ট্রাফিক লাইটগুলোকে সচল করে দিয়ে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য। আগে অতিরিক্ত চাপ ছিল, এখন সেই চাপ নাই। আমরা যদি ট্রাফিক লাইটের পদ্ধতিতে চলে যাই, সময় কম কম করে যদি বারবার ছেড়ে দেই, মানুষ একটু যদি চলমান থাকে, যতক্ষণই লাগুক অনেকক্ষণ বসে আছি সেই অনুভূতিটা হবে না। সেভাবেই আইজিপির সঙ্গে কথা হয়েছে। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলে দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ে হওয়াতে অনেক যানজট সহনশীল হয়ে গেছে। এখনো কিছু কিছু এলাকা আছে। এক্সপ্রেসওয়ে এখন ফার্মগেট পর্যন্ত করা হয়েছে, পুরোটা হয়ে গেলেই সেই সুযোগটাও মানুষ পাবে। আরো পাঁচটা মেট্রোরেল সারা ঢাকাজুড়ে হবে। সেভাবে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

জার্মানি সফরের বিষয়ে আজ (শুক্রবার) সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। ১৬-১৮ ফেব্রুয়ারি জার্মানির মিউনিখ শহরে অনুষ্ঠিত হয় ৬০তম মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স। সে বিষয়েই আজকের সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম ও বেগম মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।