চীনের অর্থনীতি কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দেশটির আর্থিক খাত এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিংয়ের পক্ষে ক্রমবর্ধমান ঋণের ব্যয় বহন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এটা চীনের আর্থিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

চলতি ডিসেম্বরের শুরুতে মুডি’স চীনের ঋণমান স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছে। ২০২১ সালের শুরু থেকে ৫০টির বেশি চীনা প্রপার্টি ডেভেলপার বন্ড খেলাপি হয়েছে। কয়েকটি স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ খেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করার অভিযোগ তুলেছে। দেশের ৬৮টি কোম্পানির মধ্যে সাতটি গত ছয় বছরে ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটির আর্থিক খাতে দুটি চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমত, কয়েক দশক ধরে তিনটি খাতে (প্রপার্টি, রফতানি ও স্থানীয় সরকার) তীব্র টানাপড়েন চলছে, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ পরিশোধ করা কঠিন করে তুলছে। দ্বিতীয়ত, চীনা জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিয়েছে, যা ভোগ, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও জন্মহারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ সমস্যা আর্থিক খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

২০০৭-২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট আগামী বছর চীনে ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকলেও আর্থিক সংকটের সম্ভাবনা কম। কারণ বেইজিং ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৮ সালের লেহম্যান ব্রাদার্সের ঘটনার মূলে ছিল পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থার অভাব। ওই সময় এটাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করা হয়েছিল।

চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ঋণ দেয়। এর তুলনায় অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সামান্য ঋণ দেয়। ২০০৮ সাল থেকে বার্ষিক ঋণ চীনের জিডিপিতে ৩০ শতাংশ শক্তি জুগিয়েছে। এর তুলনায় ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ছিল জিডিপির ৯ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫ শতাংশ ও ভারতের ৭ শতাংশ। প্রতি বছর অর্থনীতিতে এত বড় অর্থের জোগান খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কমিয়েছে। একইভাবে চীনা ঋণের ৯০ শতাংশ রেনমিনবিতে (স্থানীয় মুদ্রা) লেনদেন হয় এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিনিয়োগ করা হয়। এ মুদ্রা বিদেশে লেনদেন করা যায় না। ফলে বিদেশে পাচারের প্রশ্নই ওঠে না। বেশির ভাগ আমানত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোয় সংরক্ষিত থাকে। এভাবে অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থান বজায় রাখে।

এর মানে এই নয় যে চীন তার বর্তমান ঋণ সমস্যা থেকে রক্ষা পাবে। প্রপার্টি খাতের পতন, অন্য দেশে কারখানা স্থানান্তর ও শূন্য-কভিড নীতির কারণে ঋণদাতাদের ক্ষতি হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে তারল্য সহায়তা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রপার্টি ডেভেলপার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সরকারের জন্য ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এভাবে কর্তৃপক্ষ ব্যাংকগুলোকে সংকটের হাত থেকে রক্ষা করেছে।

অর্থনীতিবিদরা জানান, চীনের ক্রমবর্ধমান ঋণ সমস্যার প্রধান দিক হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ অস্বীকার করা। চীনা কর্তৃপক্ষ ক্ষতিকে যত বেশি অস্বীকার করবে, পরিস্থিতি তত বেশি খারাপ হতে থাকবে। ঋণের প্রকৃত অবস্থা জানলে ব্যাংকগুলো আগে থেকে সতর্ক হতে পারত।

যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়াত্ব ঘোষণা আরেক চীনা কোম্পানির:

যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়াত্বের কথা জানিয়ে সুরক্ষার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান আয়ুযান। মূলত মামলার ধকল থেকে বাঁচতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি।

চীনের রিয়েল এস্টেট খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দেউলিয়াত্বের সংকট থেকে সুরক্ষার আবেদন করেছে। এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন আয়ুযান। চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজুভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রে চ্যাপ্টার-১৫ শীর্ষক আইনের একটি ধারায় কোনো বিদেশী কোম্পানির মার্কিন সম্পদ সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে, যাতে ওই কোম্পানি তার ঋণ পরিশোধের বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। চলতি বছর এর আগে চীনা রিয়েল এস্টেট খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এভারগ্রান্ডে গ্রুপও চ্যাপ্টার-১৫-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়াত্ব থেকে সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছে। আয়ুযান গ্রুপের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একই আবেদন করা হয়।

এর আগে গত ২৯ নভেম্বর আয়ুযান গ্রুপ জানায়, ঋণদাতারা তাদের একটি পুনর্গঠন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। আগামী ৮ জানুয়ারি হংকংয়ের আদালতের এক রায়ের পর ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর বিষয়ে আশাবাদী কোম্পানিটি।

গত সেপ্টেম্বরে আয়ুযান নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার একটি চিত্র প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, গত জুনের শেষ পর্যন্ত তাদের মোট দায়ের পরিমাণ কোম্পানির বিদ্যমান ৩ হাজার ৬৫১ কোটি ইউয়ান (৫১৪ কোটি ডলার) সম্পদের চেয়েও বেশি।

নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো শেষ করার জন্য বিনিয়োগকারী খুঁজে পেতে চীনের রিয়েল এস্টেট খাতের বেশকিছু বড় প্রতিষ্ঠানকে এখন রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে।

আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডি’স অ্যানালিটিকসের চিফ ইকোনমিস্ট স্টিভেন কখরেন বলেন, ‘এ সংকটের মূলে রয়েছে অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করা। কেননা এর মাধ্যমে অন্তত কিছুটা হলেও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।’

আয়ুযান ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জানিয়েছিল যে ৬৫ হাজার ১২০ কোটি ডলার মূলধন পরিশোধের জন্য পাওনাদারের দাবি পূরণ করতে পারেনি। ফলে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিং কোম্পানিটিকে ‘‌সিলেক্টিভ ডিফল্ট’ ডাউনগ্রেড করে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল তখন আয়ুযানকে কভার করা বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে দুর্বল তারল্য ও অর্থায়নের অভাব”সম্পর্কে সতর্ক করে। ২০২২ সালের মে মাসে ফিচ রেটিংস কভার প্রত্যাহার করার পর প্রধান বৈশ্বিক ঋণমান সংস্থাগুলো কোম্পানিটির ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এর প্রধান কারণ ছিল পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি।