ভূমিসেবায় দালালদের দৌরাত্ম্য ফেসবুকেও

সহায়তার নামে হাতিয়ে নেয় অর্থ # অনিয়ম ঠেকাতে আসছে এজেন্টভিত্তিক পরিসেবা

|সৈয়দ রিফাত|

দেশের ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে’ এসব দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও। ফেসবুকে ভূমি সেবা সহায়তা এবং পরামর্শভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে ই-নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, ই-পর্চা ইত্যাদি সেবার নামে এসব দালাল মানুষের কাছ থেকে সরকারি ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সেবার নামে অগ্রিম অর্র্থ নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগও আছে। এ ধরনের দালালদের কারণে মানুষের মধ্যে ভূমিসেবা নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে। ভূমি মন্ত্রণালয় বলছে, অনিয়ম ঠেকাতে এবং গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে তারা এজেন্টভিত্তিক পরিসেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে এবং সহজে সেবা পাওয়ার পরামর্শ দিতে ফেসবুকে অনেক গ্রুপ রয়েছে। কয়েকটি গ্রুপ আছে, যাদের সদস্য সংখ্যা লাখের বেশি। এসব গ্রুপে সাধারণত ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিয়ে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা, জিজ্ঞাসা ও পরামর্শ তুলে ধরা হয়। মূলত এসব গ্রুপে দালালদের উপস্থিতি বেড়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, অনেক দালাল ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সহজ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে বলেন। গ্রাহকরা যোগাযোগ করলে তারা নানা যুক্তি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেন।

তারিকুল নামের এক ব্যক্তি ভূমিসেবাসংক্রান্ত একটি গ্রুপে লিখেছেন, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, প্রোফাইল খোলা, খতিয়ান ও দলিলসংক্রান্ত সমস্যায় তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি সঠিক সমাধান দিতে পারবেন। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ই-নামজারির কাজে সরকারি ফির বাইরে আবেদনের জন্য তিনি ৩০০ টাকা এবং কাজ শেষ হওযার পর আরও ৩০০ টাকা দাবি করেন। শামীম রেজা নামের একজনের সঙ্গে ‘এসএ’ পর্চার ম্যাপের জন্য যোগাযোগ করলে তিনি ১২০০ টাকা দাবি করেন।

অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারিকুল জানান, নিজের সময় নষ্ট করে সহায়তা করবেন; এ কারণে তাকে এ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।

ভূমি জরিপ সংক্রান্ত একটি গ্রুপের সদস্য সুজন শর্মা। তিনি জানান, ‘বিএস’ ড্রাফট বের করে দেওয়ার কথা বলে জহিরুল ইসলাম নামের একজন ১৫০০ টাকা নিয়ে মেসেঞ্জারে ব্লক করে দেন। পরে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

আসাদুল ইসলাম নামের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা যারা জমি-জমা সংক্রান্ত কাজ কম বুঝি, তারা এসব গ্রুপে আসি সাহায্যের জন্য। তবে এখানেও দালালদের উৎপাত বেড়ে যাচ্ছে।’

এদিকে দালালদের নিয়মের বেড়াজালে আনতে দ্রুতই কার্যকরী ব্যবস্থা আসছে বলে জানিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এজন্য এজেন্টভিত্তিক পরিসেবার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এর মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত এজেন্টের বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে কেউ ভূমিসেবার জন্য আবেদন করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে নামমাত্র সেবামূল্যের বিনিময়ে গ্রাহকরা বিভিন্ন ভূমিসেবার আবেদন করতে পারবেন। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট ও পারফরম্যান্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মো. জাহিদ হোসেন পনির বলেন, ‘ডিজিটাল ভূমিসেবার আওতায় আমরা গ্রাহকদের সহজে সেবা গ্রহণ অনেকাংশে নিশ্চিত করতে পেরেছি। আশা করি, ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা ভূমির অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল করতে পারব। অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে আমরা এজেন্ট ভিত্তিক পরিসেবার পরিকল্পনা নিয়েছি। যার খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পথে। আমরা সারাদেশে এ ধরনের সেবা প্রদানকারী এজেন্টদের তালিকা করে তাদের প্রস্তাব দেব এই কার্যক্রমের আওতায় আসতে।’

জাহিদ হোসেন পনির বলেন, নতুন করে এজেন্ট অন্তর্ভুক্তকরণের ব্যবস্থাও থাকবে। গ্রাহক হয়রানি বন্ধে প্রতিটি আবেদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি ধার্য করা হবে। কেউ অনিয়ম করলে বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে তার জামানত বাজেয়াপ্তসহ লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তির বিধানও থাকবে।