প্রতিমন্ত্রীর বাসায় লঙ্কাকাণ্ড
গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বাসায় ঘুষের টাকা ফেরত চেয়ে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ
তিনজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির পাল্টা অভিযোগ

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের সরকারি বাসভবনে গতকাল সকালে হাউস গার্ডদের সঙ্গে কয়েক ব্যক্তির ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। সেখানে তিন ব্যক্তি মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের একজনের অভিযোগ, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য দেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় মারধরের শিকার হয়েছেন তারা।

তাদের একজন মো. আবু সুফিয়ান বিশ্বাস বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও খুলনা জেলা শাখার আহবায়ক। তিনি জেল পুলিশের একজন সদস্য, খুলনা জেলায় কর্মরত। অন্য দুজনের নাম জানা গেলেও পরিচয় জানা যায়নি। ওই তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে রমনা থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এ ঘটনার পর কয়েকটি গণমাধ্যমের অনলাইনে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মাহবুবুর রহমান তুহিন ঘটনার ব্যাখ্য দিয়েছেন। সেই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ৮ ডিসেম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রথম পর্বের পরীক্ষা হওয়ায়, ভিড় ও তদ্বির এড়াতে প্রতিমন্ত্রীর মিন্টো রোডস্থ বাসায় অপরিচিত কাউকে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধ করা হয়। গতকাল কয়েক ব্যক্তি প্রতিমন্ত্রীর মিন্টো রোডস্থ সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করতে চাইলে হাউসগার্ড বাধা দেয়। কিন্তু তারা বাধা অগ্রাহ্য করে বাসার ভেতর প্রবেশ করেন। এবং গার্ডদের সঙ্গে চিৎকার, চেঁচামেচি ও ধস্তাধস্তি করতে থাকেন। শোরোগোল শুনে বাসার লোকজন জানতে এলে তাদের সঙ্গেও ওই ব্যক্তিরা দুর্ব্যবহার শুরু করেন। একপর্যায়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

চাকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন, চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৪৮ জন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কাছ থেকে ৯৪ লাখ টাকা নেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়রা। তার ব্যক্তিগত সহকারী কল্লোলের সম্মুখে প্রতিমন্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে লিটন ও ড্রাইভার মোমিনকে এ টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীই তাদের সঙ্গে লেনদেন করতে বলেছিলেন। এ বাবদ আরও টাকা দেওয়ার কথা ছিল। সে টাকা চাকরির পর দেওয়ার রফা হয়। এ কাজের সমন্বয় করেছিলেন আবু সুফিয়ান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরও চাকরি না হওয়ায় প্রতিমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে দেখা করেন আবু সুফিয়ান ও অন্যরা। মন্ত্রী তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা ফেরত পাননি ভুক্তভোগীরা। গত মে মাসে ৪৮ জনের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ জানান আবু সুফিয়ান। এতে ক্ষুব্ধ হন প্রতিমন্ত্রী।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি জাকির হোসেন। এতে প্রতিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের ওপর। গতকাল তাদের টাকা ফেরত নেওয়ার কথা বলে মন্ত্রীর বাসায় ডাকেন ব্যক্তিগত সহকারী কল্লোল। কল্লোলের কথায় সকাল ১১টায় মন্ত্রীর মিন্টো রোডের বাসায় যান আবু সুফিয়ান, নাছির হাওলাদার ও জাহিদ হাসান নামের তিনজন।

চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, আবু সুফিয়ানসহ ওই তিনজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী কল্লোলের রুমে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যে ওপর থেকে ওই রুমে আসেন প্রতিমন্ত্রী। তারপর কর্মচারী ও বাসার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ৭ থেকে ৮ জন ওই রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে তাদের পেটাতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ছোটাছুটি করে রুমের দরজা খুলে ফেলেন তারা। নাছির হাওলাদার ও জাহিদ হাসান প্রধান ফটক দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। আবু সুফিয়ান পাশের দেয়াল টপকে ডিবি কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। পরে ডিবি কার্যালয়ের নিরাপত্তা সদস্যরা তাকে আটক করেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীর বাসার অফিস সহায়ক মো. মমিন রমনা থানায় আবু সুফিয়ানসহ অজ্ঞাত তিনজনের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে জানান বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে সেটা জিডি না মামলা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে সকাল ১১টার দিকে আসামি মো. আবু সুফিয়ানসহ অজ্ঞাত-পরিচয় তিনজন গেটে ধাক্কা দিলে নিরাপত্তাকর্মী মো. রাসেল পকেট গেট খুলে পরিচয় জানতে চান। তখন তারা জোরপূর্বক বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেন ও রাসেলের ইউনিফর্মের কলার ধরে কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। তার হাতের আগ্নেয়াস্ত্র তারা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আবু সুফিয়ান বলেন, মন্ত্রীকে খবর দে, আমাকে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। তখন রাসেলের ডাকে বাসার অন্য কর্মীরা ছুটে গেলে আবু সুফিয়ান ডিবি পুলিশের হেড কোয়ার্টারে ঢুকে পড়েন। আবু সুফিয়ান ডিবি হেডকোয়ার্টারে আটক আছেন।

রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরাও জেনেছি। তবে তা ডিবি অফিস দেখভাল করছে। আমাদের কাছে অভিযোগ এলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গত রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাল (আজ শুক্রবার) প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা। এ অবস্থায় কে বা কারা প্রতিমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে চেঁচামেঁচি করেছে। তারা কাকে টাকা দিয়েছে সে প্রমাণও নেই। স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তার স্বার্থে ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে। আমরা জেনেছি, এ ঘটনায় এক ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে আছে।’

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবু সুফিয়ান আমাদের যুগ্ম মহাসচিব। বাকি দুজন আমাদের সদস্য নন। তবে ওই দুজনের একজন আমাদের সংগঠনের চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাপারটি জানিয়েছেন। আমিও জেনেছি। ঘটনাটি একান্তই তাদের ব্যক্তিগত, আমাদের সংগঠনের কোনো ব্যাপার নয়।’