জাহিদ বিপ্লব, ঢাকা টাইমস

সরকার পতনের একদফা ঘোষণার পর প্রায় সাতমাস রাজপথে আন্দোলনে থেকেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপিসহ সমমনা জোটগুলো। আন্দোলন উপেক্ষা করে এরই মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থ বারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। প্রশ্ন উঠেছে, এ পরিস্থিতিতে কী করবে বিএনপি? তাহলে কি আবারও পাঁচ বছর আন্দোলন চালিয়ে যাবে দলটি? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দলের কর্মীদের মধ্যে।

তবে, ‘একতরফা’ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ‘ভোট বর্জনকে’ আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় হিসেবেই দেখছে বিএনপি। আন্দোলনরত বিরোধী নেতাদের দাবি, বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে যায়নি। নির্বাচনে ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভোট পড়েছে। তাই দেশবাসীকে এবার নতুন সরকারকে বর্জনের আহ্বান জানাবে দলটি। ‘একতরফা’ নির্বাচন করার প্রতিবাদে আপাতত হরতাল-অবরোধের মতো হার্ডলাইনের কর্মসূচিতে যাবে না তারা। সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা, গণসংযোগের মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে। একইসঙ্গে মামলা ও কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও খোলা হয়েছে।

সরকার পতনের একদফা ঘোষণার পর প্রায় সাতমাস রাজপথে আন্দোলনে থেকেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপিসহ সমমনা জোটগুলো। আন্দোলন উপেক্ষা করে এরই মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থ বারের মতো সরকার গঠন করেছে।

ভোটারবিহীন এবং বিরোধীদল ছাড়া এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ, আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। একেও জয়ের একটি অংশ হিসেবে দেখছে বিএনপি।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, সারাদিন কেন্দ্রগুলো খালি ছিল। সেখানে ‘৪১ দশমিক ৮ শতাংশ’ ভোট দেশ-বিদেশে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। আবার নির্বাচনের শেষ এক ঘণ্টায় ১৪ শতাংশ ভোটগ্রহণ হয়েছে। এক ঘণ্টায় এত ভোট পড়ায় কী ধরনের কারচুপি হয়েছে তা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে বলে মনে করে দলটি। ফলে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বলেও মনে করেন তারা।

বিএনপি নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনে কারচুপির কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে এবং নানামুখী চাপ প্রয়োগ করতে পারে। পশ্চিমারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেই পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে দলটি।

এদিকে, আন্দোলন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতারা সমমনা রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক শরিক নেতা ঢাকা টাইমসকে জানান, সভায় চলমান একদফা আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া আগামীতে রাজপথে থাকা সব দলকে একমঞ্চে ওঠার প্রস্তাব দেয় শরিক দলগুলো।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রবিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, ভোটের দিনের পরিস্থিতি, দলের পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ভোট বর্জনের আহ্বানে দেশবাসী অভূতপূর্ব সাড়া দেওয়ায় খুশি দলটির হাইকমান্ড। ভোটকেন্দ্রে না যাওয়াকে সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন তারা। দেশের বেশির ভাগ মানুষ বিএনপির নির্দলীয় সরকারের আন্দোলনকে সমর্থন করছে। এতে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা অনেকটা চাঙ্গা।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা টাইমসকে বলেন, “আমরা নির্বাচন করিনি। জনগণ এ প্রহসনের নির্বাচন প্রত্যাখান করেছে। এখানে দেশবাসীর বিজয় হয়েছে। সরকার ‘নিজেরা, মামুরা এবং ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে তামাশা করেছে।”

তিনি বলেন, “আসল গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরে না আসা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। বাকশালি শক্তির বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম তা জয়ী হওয়া না অবধি জনগণ রাজপথ ছাড়বে না।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ঢাকা টাইমসকে বলেন, “এই ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে বর্জনের জন্য আমরা জনগণকে আহ্বান জানাব। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। অনেক সিনিয়র নেতাদের নামে রয়েছে মামলা। অনেককে দেওয়া হয়েছে সাজা। এসব বিষয় মাথায় রেখে আমাদের সামনে কর্মসূচি দেব।”

বিএনপির সহ-স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূইয়া জুয়েল ঢাকা টাইমসকে বলেন, “মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নেই যা তারা নেয়নি। সরকারের এত চেষ্টার পরও দেশের মানুষ এই একতরফা নির্বাচনকে নীরবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ভোট দিতে যায়নি। এই নির্বাচনে আরেকটি বিষয়টি প্রমাণিত হলো, সরকারের প্রলোভনে ফাঁদে পা দিয়ে ‘কিংস পার্টি’গুলোর যেসব নেতা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল তারা টিস্যু পেপার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ যে নিজের দলের নেতা ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করে না সেটা স্পষ্ট হয়েছে।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার যদি আগামীতে ক্ষমতার বলে বন্দুকের নলের ওপর নির্ভর করে তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা করে তাহলে তারা বাংলাদেশের মানুষ শুধু নয়, সারা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক হিসেবেই বিবেচিত হবে। তাই জনগণের ইচ্ছায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম রাজপথে অব্যাহত রাখবে এবং সেই আন্দোলন-সংগ্রাম হবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “মূলত আমরা অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে বলেছিলাম যে, নির্বাচনে ভোট না দেওয়া, নির্বাচন বর্জন করা। এই অসহযোগ আন্দোলনটা নির্বাচনের উদ্দেশ্যে আমরা ঘোষণা করেছিলাম। আমরা অসহযোগের আহ্বান জানিয়েছিলাম। জনগণ ভোট বর্জন করেছে।”