মেধাবীরা অপরাধে জড়ালে জাতির জন্য বিপজ্জনক

| মিজান মালিক |

একজন মেধাবী নাগরিক তার মেধাকে কাজে লাগিয়ে জাতি গঠনে যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, ঠিক উলটো অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়লে জাতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ান। পিকে (প্রশান্ত কুমার) হালদার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানুষ ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ হয়ে যায়। পিকে হালদারও তেমনি। তার কাছে দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ অনেক বড় ছিল।

পিকে হালদার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে রোববার ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে একথা বলেন বিচারক। এদিন দুপুরে ঢাকার ১০নং বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম অর্থ লোপাটে জড়িত ১৪ জনকে বিভিন্ন সাজা দেন।

আদালত বলেন, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পিকে হালদার দেশের জন্য কিছু না করে এবং উন্নয়নে অংশ না নিয়ে সম্পদের নেশায় মত্ত হন। দেশ থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে দেশের সর্বনাশ করেছেন। দেশের চেয়ে তার নিজের স্বার্থ বড় ছিল। তাকে ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। তার মতো আরও যারা দেশের সম্পদ বাইরে পাচার করে, যারা বিদেশে অবৈধভাবে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলে, তারা কখনো দেশকে ভালোবাসে না।

বিচারক বলেন, আমরা যেন নিজের সামান্য ব্যক্তিস্বার্থের জন্য মানি লন্ডারদের (অর্থ পাচারকারী) সহযোগী না হই। কারণ, অর্থ পাচারকারীরা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তারা দেশ ও জাতির শত্রু। অভিযুক্ত পিকে হালদার এতটুকু ছাড় পাওয়ার যোগ্য নয়। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে তাকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার। আমাদের দেশকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে অর্থ পাচারকারীদের প্রতিহত করতে হবে।

আদালত বলেন, পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর থানার দিঘিরজান গ্রামের বাসিন্দা পিকে হালদারের মা একজন শিক্ষিকা ছিলেন। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন পিকে হালদার। তার সুযোগ ছিল দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার। কিন্তু তিনি তার পরিবর্তে সম্পদ গড়ার নেশায় মত্ত হন। মেধাবীর খ্যাতি থেকে নাম উঠান আসামির খাতায়। তিনি তার মা, আপন ভাইসহ ঘনিষ্ঠদের সহযোগিতায় অসংখ্য নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন।

বিচারক বলেন, তার (পিকে হালদার) মতো অর্থ পাচারকারীদের কোনো আদর্শ নেই। তারা কোনো আদর্শ লালন করে না। অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তারা দেশের উন্নয়নের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে। প্রকৃতপক্ষে তারা দেশ ও জাতির শত্রু। জাতীয় স্বার্থ ও দেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সম্মিলিতভাবে তাদের প্রতিহত করতে হবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত দেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে আইনি প্রতিবন্ধকতার বিষয়েও ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের (এমএলএআর) কার্যক্রম পেন্ডিং রয়েছে। যদিও এটি অনেক আগেই কানাডায় পাঠানো হয়েছিল।

বিচারক আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র একা অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা এবং দেশের নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের দেশ থেকে অর্থ পাচার অপরাধ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

এদিকে, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে রায়ের বিষয়ে দুদকের কমিশনার জহিরুল হক রোববার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, এটা একটা দৃষ্টান্তমূলক রায়। দুদকের জন্য বড় ধরনের অ্যাচিভমেন্ট। তার মতো আরও যেসব অপরাধী রয়েছে, দুদক তাদের ব্যাপারে সজাগ আছে। তথ্য-উপাত্ত পেলে যে কাউকে আইনের আওতায় আনতে দুদক বদ্ধপরিকর। এ মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রসিকিউশনকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে।

রায়ের বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এ রায়ে একটি বার্তা রয়েছে। দেশের সম্পদ যারা লুট করে তাদের জন্য বার্তা। জনগণের জন্য বার্তা। অর্থ পাচারকারীদের কোনো ধরনের অনুকম্পা করা যাবে না। তাদের ভবিষ্যতেও এভাবে সাজা দিতে হবে।