অনলাইন ক্লাস ফিরিয়ে এনেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা: কভিড প্রাদুর্ভাবের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের বিস্তার ঘটে অতিদ্রুত। প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা—সব পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমকে স্বাভাবিক রাখতে অনলাইনে ক্লাস চালু করে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান। সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচিসহ নানা পদক্ষেপে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসায় পাঠদানের ক্ষেত্রে অনলাইন পদ্ধতির ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর হরতাল-অবরোধকে ঘিরে বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারো অনলাইন পাঠদানে ফিরেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৯ অক্টোবর বিএনপি প্রথম দফায় হরতাল ঘোষণার পর থেকেই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি অনলাইনেও পাঠদান শুরু করে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পাশাপাশি বছরের শেষ সময়ে সেশনজট এড়াতেই হরতাল-অবরোধের দিনগুলোয় অনলাইন পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘ হলে অনলাইন পাঠদান সত্ত্বেও কভিডকালীনের মতোই ফের তৈরি হবে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি।

বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হরতাল-অবরোধের দিনে অনলাইনে ক্লাস এবং ছুটির দিনে সশরীরে ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ২৯ অক্টোবর থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; ৩১ অক্টোবর থেকে আহ্‌ছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, গ্রিন ইউনিভার্সিটি; ৩ নভেম্বর থেকে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ এবং ৫ নভেম্বর থেকে অনলাইনে পাঠদান শুরু করেছে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি। এছাড়া অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ এবং কিছুসংখ্যক দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে অনলাইনে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট কাউন্সেলর অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে অধিকাংশ ডিপার্টমেন্টের ক্লাস শেষ। এখন পরীক্ষা শুরু হবে। যে অল্পসংখ্যক ডিপার্টমেন্টের কিছু ক্লাস বা মেকআপ ক্লাস বাকি আছে সেগুলো অনলাইনে নেয়া হচ্ছে। আর পরীক্ষাগুলো ছুটির দিনে বা হরতাল-অবরোধ নেই এমন দিনে সশরীরে নেয়া হবে। সহজ কথায় আমরা বর্তমানে ব্লেন্ডেড এডুকেশন সিস্টেমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’

শুক্র ও শনিবারে ক্লাস নেয়ার মাধ্যমে সময় সমন্বয় করা হচ্ছে জানিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সাধারণত সপ্তাহে চারদিন ক্লাস নিতাম। এখন চেষ্টা করছি শুক্র-শনিবারসহ সপ্তাহে যেসব দিন অবরোধ নেই সে দিনগুলোয় ক্লাস নিয়ে সমন্বয় করতে। যদি এভাবে সমন্বয় করা সম্ভব না হয় এবং হরতাল-অবরোধের দিনে ক্লাস নেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে সেগুলো অনলাইনে নিচ্ছি। তবে ক্লাস অনলাইনে নিলেও পরীক্ষাগুলো সশরীরে নেয়া হচ্ছে।’

সশরীরে ক্লাসের চেয়ে অনলাইনে পাঠ গ্রহণ অধিক চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ফয়েজ মাহবুব বলেন, ‘সশরীরে ক্লাসের ক্ষেত্রে যে মনোযোগ দেয়া যায় সেটি অনলাইনে সম্ভব না। গত কয়েক দিনে আমি যেসব ক্লাস অনলাইনে করেছি সেগুলো নিয়ে নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারছি না। বিশেষ করে সিএসই, ইইইর বিভিন্ন বিষয় অনলাইন ক্লাসে পুরোপুরি বোঝা প্রায় অসম্ভব। সাধারণ সময়ে ক্লাসে বিষয়গুলো বুঝতে আমার যতটা পরিশ্রম করতে হতো এখন তার দ্বিগুণ করতে হচ্ছে।’

শিক্ষার্থীদের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসে কিছুটা ঘাটতি তো থেকেই যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এর বিকল্প কোনো উপায় নেই। এ মুহূর্তে অনলাইন ক্লাস চলমান না রাখলে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে।’

একই মন্তব্য করে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ড. এএফএম আওরঙ্গজেব বলেন, ‘সশরীরে ক্লাস ও অনলাইন ক্লাসের মধ্যে মানের পার্থক্য অবশ্যই থাকে। তবে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধের তুলনায় অনলাইনে চালু থাকা ভালো। এর মাধ্যমে আমরা ৫০ শতাংশ হলেও তো শেখাতে পারছি। করোনাকালে প্রায় সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই অনলাইন ক্লাসের সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এ পদ্ধতিতে ক্লাস নিতে খুব একটা সমস্যা হবে না বলেই আশা করি।’

শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বেশকিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন্দ্রীয় ঘোষণার পরিবর্তে ডিপার্টমেন্টভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. শাহজাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি অনাবাসিক। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমরা হরতাল-অবরোধের দিনে অনলাইনে ক্লাস এবং অন্যান্য দিনে সশরীরে ক্লাস নিচ্ছি। তবে আমরা চাই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হোক। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা বিজ্ঞাননির্ভর যেসব বিভাগ রয়েছে সেগুলোয় ল্যাব এবং সশরীরে ক্লাস অপরিহার্য। আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন অনলাইনে এসব বিষয়ে পরিপূর্ণভাবে শেখানো সম্ভব নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের সভাপতি ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ৩০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। হরতাল-অবরোধের কারণে যদি শিক্ষার্থীদের পক্ষে সশরীরে ক্লাসে আসা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় তাহলে তারা আমাদের জানায় এবং সে অনুযায়ী অনলাইনে ক্লাস নিই। তবে চেষ্টা করি আমাদের ক্লাসগুলো যতটা সম্ভব সশরীরেই নেয়ার।’

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরুর পর পরই অনলাইনে পাঠদান শুরু করে দেশের অধিকাংশ ইংলিশ মিডিয়াম, কিন্ডারগার্টেন ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম প্যারেন্টস ফোরোমের সভাপতি একেএম আশরাফুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন ক্যাম্পাস শিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দু-একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলই বর্তমানে অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়ে পাঠদান শুরু করেছে। এক্ষেত্রে শুক্র, শনি ও মঙ্গলবার সশরীরে ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া হয় এবং বাকি দুদিন অনলাইনে ক্লাস নেয়া হয়।’

অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি থেকে যাবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরাও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষা অনওয়ে কমিউনিকেশনের বিষয় নয়। পরিপূর্ণ শিক্ষা সেটাই যেখানে শিক্ষক একটা বিষয় বলবেন, বোঝাবেন এবং শিক্ষার্থী সরাসরি সে বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবেন। এখানে আই কনট্যাক্ট, মুখভঙ্গিসহ সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনলাইন শিক্ষায় এ বিষয়ে ঘাটতি থাকে। তাই অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে শিখন ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। এমনকি অনলাইন শিক্ষা সশরীরে শিক্ষার বিকল্পও হতে পারে না।’