প্রচ্ছদ » জাতীয় » অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: সংস্কার থেকে সংসদীয় পরীক্ষার মুখে
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: সংস্কার থেকে সংসদীয় পরীক্ষার মুখে
একুশ প্রতিবেদন
১১ মার্চ ২০২৬ , ৬:৪৮:৪০
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল ছিল আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের এক উত্তাল সময়। সংসদ না থাকায় রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ এখন বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিচে এই অধ্যাদেশগুলোর ইতিবৃত্ত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি বিশেষ ফিচার তুলে ধরা হলো:
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: সংস্কার থেকে সংসদীয় পরীক্ষার মুখে
১. অধ্যাদেশের পরিসংখ্যান ও প্রবাহ
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। সময়কাল অনুযায়ী এর চিত্র ছিল নিম্নরূপ:
-
২০২৪ (শেষ ৪ মাস): ১৭টি অধ্যাদেশ (গড়ে প্রতি ৯ দিনে ১টি)।
-
২০২৫ (পুরো বছর): ৮০টি অধ্যাদেশ (গড়ে প্রতি সাড়ে ৪ দিনে ১টি)।
-
২০২৬ (প্রথম ৪৫ দিন): ৩৬টি অধ্যাদেশ (গড়ে প্রতি দেড় দিনে ১টি)।
২. উল্লেখযোগ্য সংস্কার ও অধ্যাদেশসমূহ
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং জনস্বার্থ রক্ষায় বেশ কিছু বৈপ্লবিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়:
-
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা ও দায়মুক্তি অধ্যাদেশ: অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতাকে আইনি সুরক্ষা প্রদান।
-
শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫: মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়িয়ে ১২০ দিন করা এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত শিথিল করা।
-
সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ: বিতর্কিত পূর্ববর্তী আইন বাতিল ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের উদ্যোগ।
-
সামাজিক সুরক্ষা: পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ (২০২৬) ।
-
অন্যান্য: ব্যাংক রেজোলিউশন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংশোধন।
৩. বর্তমান আইনি চ্যালেঞ্জ ও সংসদের ভূমিকা
সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি জরুরি প্রয়োজনে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে নবনির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এগুলো বিল আকারে পাশ করতে হবে, অন্যথায় এগুলোর কার্যকারিতা বিলুপ্ত হবে।
৪. রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক
-
বৈধতা: সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার নীতির ভিত্তিতে বৈধ ঘোষণা করেছে।
-
রাজনৈতিক অবস্থান: বর্তমান নির্বাচিত সরকার (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা) সবকটি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিলের মতো জনপ্রিয় সংস্কারগুলো বহাল রাখার ইঙ্গিত দিলেও কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশোধনী আনতে পারে।
-
বিতর্কিত দিক: তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ বা বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত কিছু বিধান নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে দ্বিমত ও আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ ছিল মূলত একটি “শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা” পূরণের হাতিয়ার। বর্তমানে সংসদ-এ এগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে। সংসদীয় পর্যালোচনার পর এই অধ্যাদেশগুলোর কতটি স্থায়ী আইনে পরিণত হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের স্থায়িত্ব।
সুত্র: