ধর্ম

ইসলাম এবং মনোবিজ্ঞান

  ২২ আগস্ট ২০২৫ , ১:৩৭:৪৪

মুসলিম চিকিৎসক আবু জায়েদ আল-বালখি ছিলেন সাইকোথেরাপির প্রবর্তক। ভূগোল, চিকিৎসাশাস্ত্র, ফিলোজফি, থিওলজি, রাজনীতি, ব্যাকরণ, সাহিত্য ও জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। তাঁর জন্ম ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানে। তিনি ছিলেন আল-কিন্দির শিষ্য।

ইসলাম এবং মনোবিজ্ঞান একটি সমন্বিত শাখা, যা ইসলামি বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষের মন, আচরণ এবং সুস্থতা নিয়ে আলোচনা করে। এটি পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের মতো শুধুমাত্র মানসিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর না করে, শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের আন্তঃসংযোগকে গুরুত্ব দেয়, যার মূল লক্ষ্য থাকে মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। 

মূল ধারণা ও বৈশিষ্ট্য:
  • সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি:

    ইসলামি মনোবিজ্ঞান ব্যক্তি ও তার পারিপার্শ্বিক জগতকে একটি সামগ্রিক কাঠামোয় দেখে, যেখানে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতা একে অপরের পরিপূরক। 

  • আধ্যাত্মিক কেন্দ্রিকতা:

    এটি মানুষের আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার মূলে আধ্যাত্মিক দিকটিকে বিশেষভাবে বিবেচনা করে, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা হয়। 

  • নফস বা আত্মার ধারণা:

    ইসলামি পরিভাষায় ‘নফস’ বা আত্মা মানব অস্তিত্বের একটি কেন্দ্রীয় অংশ, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার আচরণের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ইসলামী মনোবিজ্ঞান এই নফসের বিভিন্ন স্তর এবং এর সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার উপর জোর দেয়। 

  • ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
    মধ্যযুগীয় ইসলামী বিশ্বে মনোবিজ্ঞান বা ইলম আল-নাফস (علم النفس) নামে এর চর্চা শুরু হয়েছিল, যেখানে দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা প্রচলিত ছিল। 
ইসলামী মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব:
  • মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ:

    এটি মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে এবং জীবনের লক্ষ্য পূরণে দিকনির্দেশনা দেয়। 

  • সমস্যার সমাধান:

    আধুনিক সমাজে প্রচলিত মানসিক সমস্যাগুলোর সমাধানে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হয়। 

  • জীবন ও সুস্থতার ভারসাম্য:
    ইসলামি মনোবিজ্ঞান মানুষকে কেবল মানসিক সুস্থতাই নয়, বরং এক সামগ্রিক সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করে, যেখানে আধ্যাত্মিক উন্নতি মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। 
আধুনিক প্রেক্ষাপট:
  • বর্তমানে ডঃ মালিক বদরি, যিনি আধুনিক ইসলামী মনোবিজ্ঞানের একজন পথিকৃৎ ছিলেন, তার মাধ্যমে এই শাখার জ্ঞান ও চর্চা আরও বিস্তৃত হয়েছে। 
  • ইসলামী মনোবিজ্ঞান বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাথে ইসলামি নীতিমালার সমন্বয় সাধন করে মানুষের পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা অর্জনে সহায়তা করে

কোরআন ও মনোবিজ্ঞান

কোরআন মানসিক সুস্থতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকে ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখার ভুল। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি কোরআন নাজিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮২)

গবেষণায় দেখা গেছে, কোরআন তিলাওয়াত মানসিক চাপ কমায়। কোরআন মানুষের নফসকে তিনটি অবস্থায় বর্ণনা করে:

  • নফস আল-আম্মারা (আদেশকারী নফস): ইচ্ছা ও লোভ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা বস্তুগত ও কামনাময়ী চাহিদার দিকে ঝুঁকে থাকে। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)
  • নফস আল-লাওয়ামা (তিরস্কারকারী নফস): নিজের ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন এবং উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা করে। (সুরা কিয়ামাহ, আয়াত; ২)
  • নফস আল-মুতমাইন্না (প্রশান্ত নফস): শান্তি ও সন্তুষ্টির অবস্থা, যেখানে নৈতিক কামনা থাকে না (সুরা ফাজর, আয়াত: ২৭-৩০)।

নফস আল-আম্মারা হলো সাধারণ মানুষের নফস, যা নিয়ন্ত্রণ করলে মানুষ নিজের দিকে বেশি তাকাবে এবং তাঁর নেতিবাচক চিন্তায় বাঁধা পড়বে। নফস আল-লাওয়ামা খানিকটা প্রশিক্ষিত, যা আমাদের ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয় এবং নফস আল-মুতমাইন্না অর্জন হয় বহু সাধনার মধ্য দিয়ে, যা ক্রমশ আল্লাহর দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করে। এটা অনেকটা কোরআনের ‘আলিফ-লাম-মিম’-এর মতো কৌশল, অর্থাৎ, সব শ্রেণির মানুষ এর অর্থ ধারণ করতে পারে না। এটি আবার মননশীলতার (মাইন্ডফুলনেস) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে গৃহীত।

নফস আল-লাওয়ামা খানিকটা প্রশিক্ষিত, যা আমাদের ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয় এবং নফস আল-মুতমাইন্না অর্জন হয় বহু সাধনার মধ্য দিয়ে, যা ক্রমশ আল্লাহর দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) চিন্তা, আবেগ এবং আচরণের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে, যা কোরআনের নফসের শিক্ষার সঙ্গে মিলে যায়। এটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসায় কার্যকর বলে প্রমাণিত।

সমন্বয়ের উপকারিতা

ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সমন্বয় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সত্যিকারের সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয়। শৈশবের স্মৃতির প্রভাব বিশ্লেষণ বা ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য বিহেভিয়ারিজম ব্যবহার করা যায়। আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন ধর্মের মানসিক দিকগুলো স্বীকার করে এবং একইভাবে কোরআনের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নির্দেশনা হৃদয়স্থিত শান্তিকেও ত্বরান্বিত করে থাকে।

তাই ইসলাম ও আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সমন্বয় মুসলিমদের মানসিক সুস্থতা এবং সমাজের বৃহত্তর সমস্যা যেমন সংঘাত, অবিচার ও দারিদ্র্য মোকাবেলায় সহায়ক হতে পারে। কোরআন ও হাদিসের শিক্ষার সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সমন্বয় করা হলে আমরা নিজেদের উন্নতি এবং সমাজের কল্যাণে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারব। শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সংযোগ আমাদের আরও ভালো মুসলিম এবং সমাজের জন্য কার্যকর ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

ইসলামী মনস্তত্ত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্যবিধির প্রবর্তন করেছিলেন আল-বালখি। ‘মাসালিহ আল-আবদান ওয়াল আনফুস’ (দেহ এবং আত্মার উন্নতি সাধন) গ্রন্থে তিনিই প্রথম শরীর এবং আত্মা সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগের আলোচনা করেছিলেন। তিনি এর জন্য শব্দ ব্যবহার করেছিলেন ‘আল-তিব্ব আল-রুহানি’ বা আধ্যাত্মিক ও মানসিক স্বাস্থ্য। তিনি বহু মেডিক্যাল ডাক্তারকে মানসিক অসুস্থতা বিষয়ে অবহেলার কারণে সমালোচনা করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে যেহেতু মানুষের আত্মা ও দেহ উভয় থেকেই মানুষের নির্মাণ হয়, সুতরাং মানুষের অস্তিত্ব স্বাস্থ্যকর হতে পারে না দেহ ও আত্মার সমন্বয় ছাড়া।

বর্তমান সমাজে মানসিক সমস্যা একটি ট্যাবু। এখনো কারো মানসিক সমস্যা হলে তাকে মানুষ অন্য চোখে দেখে। তাই আধুনিককালে চিকিৎসাশাস্ত্র মানসিক সমস্যাকে স্বাভাবিক অসুখ বলতে বাধ্য হয়েছে। মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা চলছে। সামাজিকভাবে আমরা এখনো মানসিক সমস্যাকে মেনে নিতে পারি না। আল-বালখি বহু বছর আগে এ বিষয়ে লিখে গেছেন। আল-বালখির মতে, মানসিক সমস্যাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারলেই অসুখের সঙ্গে সহজে লড়াই করা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি সেরে ওঠেন।

আল-বালখি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে তাঁর ধারণাগুলো কোরআনের আয়াত ও হাদিস থেকে গ্রহণ করেছেন।

আরও খবর