এই যুদ্ধে আমেরিকার মূলত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, সামরিক আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদী কিছু লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের এই সংকটে আমেরিকার প্রধান স্বার্থগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. পারমাণবিক ও সামরিক শক্তি ধ্বংস
আমেরিকার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি নির্মূল করা। ওয়াশিংটন মনে করে,
ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে।
২. আঞ্চলিক আধিপত্য ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক দমন
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইয়েমেন (হুথি) এবং ইরাকে তার প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। এই যুদ্ধে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও রেভোলিউশনারি গার্ড (IRGC) বাহিনীকে দুর্বল করে দিয়ে আমেরিকা এই প্রক্সি নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে চায়, যাতে ওই অঞ্চলে মার্কিন একচ্ছত্র প্রভাব বজায় থাকে।
৩. জ্বালানি ও বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ
ইরান বারবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখে। আমেরিকা এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এছাড়া, যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইরানের বিশাল তেল ও গ্যাস খনিগুলোর ওপর মার্কিন কোম্পানিগুলোর আধিপত্য তৈরির একটি সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
৪. শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (Regime Change)
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি ইরানের জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছেন। আমেরিকার অন্যতম বড় লাভ হবে যদি সেখানে একটি মার্কিন-পন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব কমাতেও সাহায্য করবে, যারা ইরানের কৌশলগত মিত্র।
৫. অস্ত্র বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পরীক্ষা
যেকোনো বড় যুদ্ধ আমেরিকার অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (Defense Contractors) জন্য বিশাল আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে নতুন প্রজন্মের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- THAAD) পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে পেন্টাগন।
সারসংক্ষেপ:
আমেরিকা এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে একটি ‘আঞ্চলিক শক্তি’ থেকে সরিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোপুরি নিজেদের এবং ইসরায়েলের অনুকূলে নিয়ে আসতে চায়।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের এই ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান আশা করেছিল তার দুই শক্তিশালী বন্ধু রাশিয়া এবং চীন সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে। তবে বাস্তবে তাদের ভূমিকা অনেক বেশি সতর্ক এবং কৌশলগত। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. রাশিয়ার ভূমিকা: সীমিত সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়
রাশিয়া ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদার হলেও এই যুদ্ধে তারা সরাসরি কোনো সৈন্য পাঠায়নি।
- গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট ডাটা: অভিযোগ রয়েছে যে, রাশিয়া তাদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনী ও সামরিক ঘাঁটির অবস্থান ইরানকে জানাচ্ছে। এর ফলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও নিখুঁত হচ্ছে।
- কূটনৈতিক সমর্থন: জাতিসংঘে রাশিয়া এই হামলাকে “সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন” বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
- সীমাবদ্ধতা: রাশিয়া নিজেই ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় ইরানের জন্য বড় কোনো সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো তাদের জন্য কঠিন। এছাড়া ইসরায়েলের সাথে সুসম্পর্ক নষ্ট করতেও পুতিন আগ্রহী নন।
২. চীনের ভূমিকা: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মধ্যস্থতা
চীন সাধারণত সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তাদের প্রধান মনোযোগ নিজেদের অর্থনীতির ওপর।
- জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা: চীনের তেলের একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। তারা ইরানকে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানালেও পর্দার আড়ালে ইরানের অর্থনীতি সচল রাখতে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে।
- প্রযুক্তিগত সহায়তা: চীনের ন্যাভিগেশন ও ড্রোন প্রযুক্তি ইরান ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হয়, যা তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
- শান্তির আহ্বান: চীন বারবার “রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে” সমাধানের কথা বলছে এবং নিজেকে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
৩. তারা কেন সরাসরি যুদ্ধে নামছে না?
- NATO-র মতো কোনো চুক্তি নেই: ইরানের সাথে রাশিয়া বা চীনের কোনো সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mutual Defense Treaty) নেই, যার ফলে তারা যুদ্ধে নামতে বাধ্য নয়।
- পশ্চিমা অবরোধের ভয়: চীন আমেরিকার সাথে তাদের বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।
- লাভের হিসাব: এই যুদ্ধে আমেরিকা ব্যস্ত থাকলে ইউক্রেনে রাশিয়ার জন্য সুবিধা হয়, আবার এশিয়ায় চীনের ওপর মার্কিন চাপ কমে যায়।
সারসংক্ষেপ: রাশিয়া ও
চীন ইরানকে কেবল ততটুকুই সাহায্য করছে যাতে ইরান টিকে থাকতে পারে এবং আমেরিকার ওপর চাপ বজায় থাকে, কিন্তু তারা নিজেরা এই যুদ্ধের আগুনে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত নয়।