আইন-আদালত

কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থ পাচার

  যুগান্তর ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৫:১৬:৩৫

টিআই’র রিপোর্ট বিশ্লেষণ

কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থ পাচার

মনির হোসেন

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যে অর্থ পাচার হয়, এর বেশির ভাগের গন্তব্য ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত ১০টি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে এসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা স্বচ্ছ। অর্থাৎ নিজেরা স্বচ্ছ থাকলেও অন্য দেশকে অর্থ পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইনের শাসনে এগিয়ে থাকায় পাচারকারীরা উন্নত ওইসব দেশ টার্গেট করেছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের পাচারের অর্থ যেসব দেশে যাচ্ছে, ওইসব দেশ উন্নত। পাচারের অর্থ ওইসব দেশে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ওখানে আইনি সুরক্ষা আছে। দেশগুলো পাচারকারীদের টাকা আটকে দেবে না। এই নিশ্চয়তার কারণেই পাচারকারীরা উন্নত ওইসব দেশ টার্গেট করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে টাকা পাচার হয়েছে, তা আর কখনোই দেশে ফেরত আসবে না। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার পাচারের টাকা ফেরানোর কথা বলেছিল; কিন্তু এটি সম্ভব নয়। কেউ এই টাকা ফেরাতে পারবে না। অর্থাৎ টাকা আর কখনোই বাংলাদেশে ফেরত আসবে না।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনের ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশে অর্থ পাচার নিয়ে যেসব সংস্থা কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম হলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি। তিন সংস্থার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশ থেকে উল্লিখিত ১০টি দেশে বেশি অর্থ পাচার হয়।

এদিকে মঙ্গলবার দুর্নীতির ধারণাসূচক (করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৫) প্রকাশ করে টিআই। সেখানে ১৮২টি দেশের তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই রিপোর্ট অনুসারে দুর্নীতি কম হয়, এ ধরনের দেশের তালিকায় সিঙ্গাপুর রয়েছে ৩ নম্বর অবস্থানে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে বড় অঙ্কের টাকা পাচার করেছে এর মধ্যে রয়েছে-এস আলম গ্রুপ, সামিট গ্রুপ এবং বেক্সিমকো গ্রুপ অন্যতম। এছাড়াও অনেক রাজনীতিক ও আমলা সেখানে টাকা পাচার করেছেন। টিআই-এর রিপোর্ট অনুসারে, ১৮২টি দেশের মধ্যে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা স্বচ্ছ দেশের তালিকায় সুইজারল্যান্ড রয়েছে ষষ্ঠ অবস্থানে। আর গত বছরের ১৯ জুন প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়, বর্তমানে দেশটির ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৮ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। কিন্তু সুইস ব্যাংকে বৈধভাবে টাকা রেখেছেন-এরকম কেউ এ পর্যন্ত সরকারকে জানাননি। টিআই-এর তালিকায় ১২তম অবস্থানে অস্ট্রেলিয়া ও হংকং। কানাডা রয়েছে ১৬তম অবস্থানে। আর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, তার মধ্যে কানাডা অন্যতম। দেশটিতে বেগমপাড়া হিসাবে একটি এলাকার নাম দিয়েছেন বাংলাদেশিরা। ওই এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করে স্ত্রীকে রেখে এসেছেন অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিক।

অস্ট্রেলিয়ায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী অর্থ পাচারের তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও টিআই-এর তালিকায় যুক্তরাজ্য ২০তম অবস্থানে। কিন্তু সম্প্রতি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের ছেলে শায়ান এফ রহমানসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। স্বচ্ছ দেশের তালিকায় ২১তম অবস্থানে সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু দেশটির বিখ্যাত শহর দুবাই বাংলাদেশের টাকা পাচারের অন্যতম হাব বা কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে চিহ্নিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যবসায়ী পালিয়ে গিয়ে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। এখনো তারা ওই দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। টিআই-এর তালিকায় ২৯তম অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে অর্থপাচার হয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের মাফিয়াদের অনেকেই বর্তমানে দেশটিতে অবস্থান করছেন। সেখানে অনেক বড় বড় রাঘববোয়াল রয়েছেন। এছাড়াও টিআই-এর তালিকায় ১৮২ দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া ৫৪ নম্বরে। কিন্তু ইতোমধ্যে অর্থ পাচার করে কয়েক হাজার বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করেছেন। জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), সুইস ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (আইসিআইজে) প্রকাশিত পানামা, প্যারাডাইস ও পেনডোরা পেপারস এবং মালয়েশিয়া সরকারের প্রকাশিত সেকেন্ড হোম তালিকা অন্যতম।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অর্থনীতির অবস্থা মূল্যায়নে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। শ্বেতপত্র কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা গত ৫ বছরে দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়ে বেশি। আলোচ্য সময়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫ বছরের পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু করা সম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে দুর্নীতি হয়েছে-ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে। ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। যার ৪০ শতাংশ অর্থ আমলারা লুটপাট করেছে।

আরও খবর