তথ্যপ্রযুক্তি

জবাবদিহিতার প্রশ্ন: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

  ফেসবুক ১ মার্চ ২০২৫ , ৫:৪৫:২২

জবাবদিহিতার প্রশ্ন

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের অব্যাহত লুটপাটের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে মিডিয়া এবং জনপরিসরে আইসিটি খাত নিয়ে ব্যাপক গণঅসন্তোষ বিদ্যমান। অভিযোগগুলোর সত্যতাও বিদ্যমান। রেভিনিউ শেয়ারিং, ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খাতে ফাইবার, ডেটাসেন্টার, আইটি পার্ক, হাইটেক পার্কের শত শত কোটি টাকা পাওনা বকেয়া রয়েছে।

স্বৈরাচারীর আমলে বরাদ্দ পাওয়া লোকেরা সহযোগিতা করছে না অনেক ক্ষেত্রে। উপরন্তু ট্রেনিং সেন্টার, আইটি পার্ক, সফটওয়্যার সেন্টার, আইটি ইনকিউবেটর, ডিজিটাল ল্যাব ইত্যাদির নামে সম্পন্ন ও আধা সম্পন্ন ভবন এবং অবকাঠামো করে রাখা হয়েছে কিন্তু সেসবের ব্যবহার ইউজকেইস/বিধিমালা নেই, রেভিনিউ নেই। প্রভাবশালীদের এলাকায় ধানক্ষেতে হাইটেক পার্কের অর্ধ সম্পন্ন স্থাপনা করার নজির উঠে এসেছে। আইটি ট্রেনিং এর নামে বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এসব তথ্য মিডিয়ার আসছে ক্রমাগত। এমতাবস্থায় পর্বতসম নাগরিক প্রত্যাশা, অতিদ্রুত দৃশ্যমান উন্নতির আশা নিয়ে, ভুলভাল প্রকল্প ভালোভাবে বাস্তবায়নের চাপ মাথায় নিয়ে আমরা একটা সম্পূর্ণ নতুন ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব নিয়েছি। যেখানে দুর্নীতি লুটপাট এবং অপব্যবস্থাপনা থামানোকে সেন্টার পয়েন্ট করা হয়েছে।

ইতোমধ্যেই জেনেছেন ছাত্র জনতার সুপারিশক্রমে মাননীয় উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আমাকে আইসিটি পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে অনুমোদন দিয়েছেন। আইসিটি ডিভিশনে একটি পূর্ণ সপ্তাহ কাজ করেছি। ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্সের বাইরে এসে দিনে প্রায় ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করছি, এক কর্ম দিবসে ৯টি অ্যাজেন্ডা ভিত্তিক মিটিং করেছি। বিগত ৬ কর্মদিবসে ২০ মিনিট ফেইসবুকে থাকার ফুশরত ছিল না। ফেসবুক যেহেতু জনপরিসর, বিকল্প মিডিয়া এবং মার্কেটপ্লেস, তাই সপ্তাহে একবার পুরো সপ্তাহের কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ তুলে ধরার ইচ্ছা রাখি, সম্ভব না হলে মাসে একবার হাইলেভেল আপডেট দিব ভাবছি| জবাবদিহিতার প্রশ্নে উপদেষ্টা নাহিদ এবং আমি সামনের দিকে থাকতে চাই।

বলে রাখা ভালো, প্রায় ১৮ বছর পরে আমি বাংলাদেশে কাজ করতে ফিরেছি। ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রবাসী আয় হিসেবে অর্জিত সম্পদের (পৈত্রিক এজমালি সম্পদ বাদে) তথ্য আয়কর রিটার্ন দেখানো আছে। নতুন অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে নেদারল্যান্ডে থাকা আমার পারিবারিক সম্পত্তিও উপস্থাপন করবো বলে ওয়াদা করছি।

দুই-

গত এক সপ্তাহে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী এবং আইসিটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সংস্থা এবং বিভাগকে সচল করতে সর্বোচ্চ কাজ করেছি। আইসিটির ডিভিশনের অধীন শাখা এবং সংস্থাগুলোর প্রায় প্রতিটিকে ‘অ্যাপ্রোচ অফ ওয়ার্ক’, ইমিডিয়েট টার্গেট, ডেটাবেজ প্রিপারেশন, অ্যাসেট ইনভেন্টরি প্রিপারেশন ইত্যাদি তৈরির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলছে চলমান প্রকল্পগুলো রিভিউর উদ্যোগ। আমরা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প থামাতে সংকল্পবদ্ধ।

ইনশিয়াল কিছু এসেস্মেন্টে দেখা যাচ্ছে এই অর্থবছরে বাজে প্রকল্প থামিয়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। এর বিস্তারিত আপনারা জানবেন।

তিন-

বিগত সপ্তাহে আমরা হাই লেভেল, হাই কোয়ালিটি কিছু অন্ত এবং আন্ত মন্ত্রণালয় মিটিং করেছি। তাতে ৩ বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে-

ক। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশের লুটপাট সর্বস্ব স্লোগান থামিয়ে ‘আইসিটি ভিশন মিশন ও স্ট্র্যাটেজি’ উপস্থাপনা।

খ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে ‘ন্যাশনাল এআই স্ট্র্যাটিজি’ তৈরি

গ। ‘ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন ডেটা ভিশন মহাপরিকল্পনা’ তৈরি। এই ডেটা ভিশনের আলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সেবার ডিজিটাইজেশন হবে যাতে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ে লাগাম টানা যায়। আমরা ডেটা ডেফিনেশন, ডেটা বাউন্ডারি, ডেটা ইউজকেস, ডেটা ফ্লো রেগুলেশন করবো, সেভাবে ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট মডিফাই করা হবে। অর্থাৎ সরকার প্রতিষ্ঠান এন্টারপ্রাইজ বিজনেস এবং ব্যক্তির ডেটা ডেফিনেশন, প্রাইভেসি রক্ষা এবং ব্যবসার বিকাশ বান্ধব ব্যবহার বিধির উপর গুরুত্ব দিয়েছি।

***নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের বৈঠকে এনআইডি ডেটাবেজকে শক্তিশালী করণ এবং সরকারি-বেসরকারি সকল সেবাকে এনআইডি ভিত্তিক রূপান্তরের উপর জোর দেয়া হয়েছে।
***স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেবা ডিজিটাল সেশনের এনআইডিকে সেন্টার পয়েন্ট করে ডিজিটাল পাব্লিক হেলথ ম্যানেজমেন্ট কন্সেপ্ট দেয়া হয়েছে।
***প্ল্যানিং কমিশনের ডিজিটাল ইকোনমিক ভিশনে ডাটা ডেফিনেশন, ডেটা বাউন্ডারি, ডেটা ইউজ কেসের রোল নিয়ে প্রাথমিক ইনপুট দেওয়া হয়েছে।

চার-

১। আইসিটি ডিভিশনের অধীন বহুল আলোচিত-সমালোচিত এটুআই উদ্যোগ/প্রকল্পগুলোকে পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। গণতন্ত্রহীনতা এবং মানবাধিকারের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে সাবেক সরকারের আমলে সম্ভাবনাময় যে-সব আন্তর্জাতিক ফান্ডেড প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব সচলের উদ্যোগ নিয়েছি।

২। ইউনেস্কোর সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সব ধরনের স্কুল এবং মাদ্রাসাগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আনতে কাজ শুরু হয়েছে।

৩। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে এটুআই প্রকল্পের মুক্তপাঠ এবং দীক্ষা নামক দুটো ইনোসিটিভ পাইলট এবং বুট ক্যাম্প (লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ) করা হয়েছে। এটুআই এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারের যৌথ তত্ত্বাবধানে ব্লেন্ডেড আইসিটি স্কিল কোর্স চালুর প্রাথমিক আলাপ হয়েছে।

৪। পাশাপাশি বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার লিমিটেড এর নির্মিত স্টেট অফ দি আর্ট কালিয়াকৈর ডেটাসেন্টারকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার করে লাভজনক ধারায় ফেরানোর প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ হচ্ছে| এখানে ওরাকল সহ ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সলিউশন সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে টেকেল করার কৌশল নিয়ে বিডিসিসিএল ডিজি বেশ আন্তরিক।

৫। হাইটেক পার্কগুলোর বিদ্যমান বরাদ্দ অপ্টিমাইজ করার জন্য কাজ শুরু করেছেন হাইটেক পার্কের ডিজি মহোদয়।

৬। ডিপার্টমেন্ট অফ আইসিটির অধীন ট্রেনিং সেন্টারগুলোর ইনভেন্টরি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। শেখ পরিবারের নামে করা আইটি/সফটওয়্যার পার্ক ইনকিউবেটর ল্যাবের নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব সেন্টার ও ল্যাবকে কীভাবে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা যায় তার প্রাথমিক ধারণা দিয়েছি আমি। আমরা চাই ইউনিয়ন পর্যায়ের ল্যাবগুলোকে ওই ইউনিয়নের সকল স্কুল এবং মাদ্রাসার জন্য কারিগরি শিক্ষার হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে, যতক্ষণ সব স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব না করা যায়। এজন্য জিও ম্যাপিং ডেটাবেজ করা হবে।

৭। আইসিটিতে ছাত্রদের অংশগ্রহণের আলোচনা হয়েছে।
সবশেষে, ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি আমাদের গুরুত্বের শীর্ষে আছে। আমরা অংশীজনদের সাথে ৫টি সাইবার সিকিউরিটি মিটিং করেছি। কর্মপরিকল্পনা দ্রুতই চূড়ান্ত হবে।

আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, আমরা বসে নেই। মিডিয়া সহ সকলের সাহায্য চাই, সময় চাই। নিশ্চয়ই সর্বোচ্চ সততা এবং আন্তরিকতা দিয়ে আমরা জাতিকে আইসিটি খাতে ভালো কিছু উপহার দিতে পারব, ইনশাল্লাহ।

আরও খবর