মতামত

ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

  মীর রবি | বিডিনিউজ ২৪ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ , ১১:১০:১৫

  • সরকার বদলালেও ঘৃণাত্মক, তুচ্ছার্থক ট্যাগ দিয়ে ভিন্নমতকে দমানোর রাজনৈতিক ধারায় গুণগত কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গ্রাফিক: মো. নূরুল মোস্তফা জিনাত
  • ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

    ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, তাতে সমাজে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় আসন্ন। কালক্ষেপণ না করে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা আবশ্যক।

    বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে ট্যাগ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল, জাতি এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সকল শ্রেণি-পেশা ও মতাদর্শের মানুষের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে। সেই লক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নে সরকারসহ সব পক্ষই নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করবে। দুঃখজনক, সেই পথে এগিয়ে না গিয়ে বরং আমরা পূর্বের ধারাবাহিকতাই বহন করছি।

    সরকার বদলালেও ঘৃণাত্মক, তুচ্ছার্থক ট্যাগ দিয়ে ভিন্নমতকে দমানোর রাজনৈতিক ধারায় গুণগত কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যে যা নয়, তাকে সেই পরিচয়ে পরিচিত করার চেষ্টা সন্দেহাতীতভাবে অপরাজনীতি বলে গণ্য হবে। ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে সমাজের সচেতন মানুষ মাত্রই উদ্বিগ্ন। আশাজাগানিয়া এই প্রজন্ম আমাদের নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাতে আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। আমরা তরুণদের ওপর আস্থা রেখে বলতে চাই, সব এখনও শেষ হয়নি, নতুন করে দেশকে সাজানোর অনেক সুযোগ আমাদের রয়েছে। রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করে আমরা আমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে উদ্যোগী হতে পারি। এই উদ্যোগের প্রথম কাজটাই হতে পারে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার।

    রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার করতে হলে প্রথমেই আমাদের ট্যাগ রাজনীতি ও ট্যাগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পূর্ববর্তী কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ট্যাগ সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে যে দমন-পীড়ন, নির্যাতন, জেল-জুলুম এমনকি হত্যার বয়ান তৈরি হয়েছিল, তা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর। এর মাধ্যমে বারবার মানুষের মানবাধিকার খর্ব করা হয়েছে। এই সংস্কৃতির দরুন মানুষের ব্যক্তি জীবন ধ্বংস হয়েছে, কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেছেন। মানব সভ্যতার জন্য এমন অকল্যাণকর ট্যাগ সংস্কৃতি ছুঁড়ে ফেলার সময় এখনই। ট্যাগ দেয়ার সংস্কৃতি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, চলাফেরা, মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের সর্বস্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, উসকে দেয় মব ভায়োলেন্স ও নৈরাজ্যবাদ। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসাটাই রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাউকে কোনো কিছুর ট্যাগ দিয়ে তার ওপর হামলা বা ব্যক্তি আক্রমণ করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বহু মত, পথ ও বহুদলীয় রাজনীতির এই দেশে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যাগ রাজনীতি ও ট্যাগ সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

    আমরা জানি, ইতোপূর্বে ক্ষমতাসীন প্রত্যেক সরকার ও সরকারদলীয় রাজনীতিকগণ প্রতিপক্ষ কিংবা ভিন্নমত দমনে ট্যাগ রাজনীতির চর্চা করেছে। প্রণয়ন করেছে বিতর্কিত আইন-কানুন। ট্যাগ সংস্কৃতির বিকাশে তাদের প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্ররা যখন মাঠে প্রাণপণ লড়ছে, তখন গত বছরের ১৪ জুলাই চীন থেকে ফিরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ ট্যাগ দিয়েছিলেন। কোটা আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধ কোটার বিষয়টি। শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে বললেন, “মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?” হাসিনার এই বক্তব্য কোটা আন্দোলনের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়ার মতো হয়।

    প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাসীনরা সব সময় তাদের নিজের লোকেদেরও সমালোচনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিপরীত ট্যাগ দিয়েছে। আর নিরপেক্ষদেরও অস্তিত্ব বিপণ্ন করে দিয়েছে।বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, শিবির, রাষ্ট্রদ্রোহী, রাষ্ট্র বিরোধী, ভারতের দালাল, বাম, শাহবাগী, রাজাকারসহ ইত্যকার ট্যাগ লাগিয়ে হেনস্থার পথ প্রশস্ত করেছে। পরিস্থিতি এমনও হয়েছে, ট্যাগের শিকার অসংখ্য মানুষ কারাবরণ করেছে এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। হত্যা করাও হয়েছে কাউকে কাউকে। আমাদের চারপাশে ট্যাগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। বিভিন্ন ট্যাগে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ ও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর বেশিরভাগই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বই, চলচ্চিত্র, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল।

    ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী শাসনামলের ১৫ বছরে দেশের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা জায়গায় যে নির্যাতনের ঘটনা হয়েছে তার মধ্যে ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী রাজনৈতিক ট্যাগের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘সোচ্চার-টর্চার ওয়াচডগ’ বলছে, এর মধ্যে ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ইসলামী ছাত্রশিবির ও ২ শতাংশ শিক্ষার্থী ছাত্রদলের রাজনীতি করার কারণে নির্যাতিত হয়েছিল।

    টর্চার ওয়াচডগের বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের এই তথ্যকে ছাড়িয়ে গেছে বিদ্যমান পরিস্থিতি। ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতির মাত্র ছয় মাস না পেরুতেই ট্যাগ সংস্কৃতি মহামারীর আকার ধারণ করেছে। ট্যাগ দিয়ে ব্যক্তি আক্রমণ শুধু নয়, মব উসকে দিয়ে বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ট্যাগের ভাষায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ফ্যাসিস্ট, ফ্যাসিবাদের দোসর, আওয়ামী লীগের দোসরসহ ইত্যাদি শব্দ। পূর্বের মতোই বিভিন্ন ট্যাগ ব্যবহার করে আক্রমণের বৈধতা দেয়া হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্যাগ সংস্কৃতির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে।

    ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চূড়ান্ত পরিণতি দেখছে বাংলাদেশ। প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার অনেকেই। যারা খানিকটা প্রতিবাদী ছিলেন, তারাও ট্যাগের হাত থেকে বাঁচতে চুপ থাকছেন। এটাই ট্যাগ দেয়ার সংস্কৃতির ভয়ঙ্কর রূপ। এটি আমাদের জাতিগত বিভাজনকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিভেদ ও সংঘাত। এই ট্যাগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর উপায় হতে পারে জাতীয় ঐক্যের একটা কমন গ্রাউন্ড তৈরি করা। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সারাদেশে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ট্যাগ রাজনীতির আক্রমণ দেখা গিয়েছে। যে জন্য ভীত সন্ত্রস্ত সাংস্কৃতিক কর্মীরাও নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

    দেশের সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের মানুষেরা রাজনৈতিক ট্যাগের বাইরে বেশি আক্রান্ত হন ধর্মকেন্দ্রিক ট্যাগে। ভিন্নমত পোষণের কারণে তারা রাজনৈতিক ট্যাগের বাইরেও অধিকতরভাবে নাস্তিক, কাফের, মুরতাদসহ ধর্মবিরোধী ট্যাগ পান। বিশেষত সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী ও উগ্রবাদীদের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা ধর্ম অবমাননা বা কটাক্ষের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এসব ঘটনা রাজনৈতিক ট্যাগ সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন, এমনটাও নয়। এই শ্রেণির মানুষদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যার ঘোষণা ও হত্যার ঘটনাও বাংলাদেশে ঘটেছে। হঠাৎ করেই তা শুরু হয়নি। স্বাধীনতার পরপরই এমন পরিস্থিতির শুরু হয়। কালপর্বে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত।

    ভিন্নমত সহ্য না করা শাসক, শোষক এবং আধিপত্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার এ-এক স্বাভাবিক প্রবণতা৷ ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাষ্ট্র– যে কোন মোড়কেই শাসন এবং শোষণের প্রক্রিয়া যখন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে, তখনই প্রকাশ ঘটে চূড়ান্ত অসহনশীলতার৷ সহনশীলতার অভাবে কথার প্রতিবাদ কথায় না হয়ে তা সহিংসতায় পৌঁছে যায়। ট্যাগের চাবুক তখন হাতিয়ার, বৈধতা এনে দেয় সংঘাতের৷ মত চেপে ধরার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটে। অসংহত ক্ষমতা, অনিরাপত্তার রাষ্ট্রিক ও সামাজিক বাতাবরণেই ট্যাগ সংস্কৃতির এস্টাবলিশমেন্টকে পোক্ত করা সম্ভব হয়৷ জ্ঞান, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমাজ-সংস্কৃতির মানবিক পাঠ থেকে দূরে থাকা প্রজন্ম ট্যাগ সংস্কৃতিকে নানা উপায়ে উপভোগ্য করে তোলে। বিধায় আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই তাদের সেই চিত্র দেখতে পাই। এই প্রজন্মের একটা অংশের ট্রল, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, মিম সুক্ষ্মভাবে ট্যাগের প্রক্রিয়াকে সমন্বিত করে। ট্যাগের এই প্রক্রিয়া ও ধরণকে নিয়ে গবেষণারও প্রয়োজন। নতুনদের ভাষাভঙ্গি ও ট্যাগ সংস্কৃতিকে ভালোভাবে বুঝে উঠতে না পারলে এই রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, তাতে সমাজে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় আসন্ন। কালক্ষেপণ না করে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা আবশ্যক। ইতোমধ্যে ট্যাগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, “ট্যাগ দিয়ে মানুষকে অপরাধী বানিয়ে আওয়ামী লীগ যে রাজনীতি করত, তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যদি তা না পারি তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বৃথা হয়ে যাবে।” তার এই আহ্বানকে আমাদের আমলে নেয়া উচিত।

     

    আরও খবর

    সাইবার নিরাপত্তা আইনে ইন্টারনেটকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি: ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

    আওয়ামী লীগের পরিণতি ও উত্তরণ

    পুলিশ সংস্কার কি আদৌ হবে, কতটুকু হবে

    আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কতিপয় প্রশ্ন

    মুক্তিযোদ্ধাদের পুনঃশ্রেণীবিন্যাস: ইতিহাসের পুনর্লিখন নাকি প্রয়োজনীয় সংস্কার?

    রাজনৈতিক দল, কর্তৃত্বপরায়ণতা ও নতুন বন্দোবস্ত

    জাতীয় নাগরিক কমিটির ৭৫ সদস্যের প্রবাসী কমিটি ঘোষণা

    বিচার চলাকালীন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল চায় এনসিপি

    “মা, ১৮ হলে আমি এডাল্ট হয়ে যাবো তাই না?

    মেয়র পদ ফিরে পাওয়া নিয়ে সমালোচনা, জবাব দিলেন ইশরাক

    সেকুলারিজমের বিপদ কাটিয়ে উঠার উপায় নিয়ে যা বললেন মির্জা গালিব

    বাংলাদেশের এত বিশেষত্ব কী? ড্যান মোজেনা

  • ফেসবুকে আমরা

    Facebook Pagelike Widget
  • আরও খবর: মতামত

    যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে

    পুলিশ সংস্কার কি আদৌ হবে, কতটুকু হবে

    হাসনাত -সারজিসদের এই আগাম বার্তা না পেলে কি হতে পারতো!

    আপনার ধর্মবোধের দায় অন্যের ওপর চাপাবেন না

    মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা কতবার বদলাবে?