আইন-আদালত

দম্ভ, দায়বদ্ধতা ও বিতর্ক: বাংলাদেশের পরিবহন খাতের তিন আমলের চালচিত্র

  একুশ প্রতিবেদন ২০ মার্চ ২০২৬ , ১:৩৭:১৩

 আওয়ামী লীগ আমল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের পরিবহন মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ফিচার:

দম্ভ, দায়বদ্ধতা ও বিতর্ক: বাংলাদেশের পরিবহন খাতের তিন আমলের চালচিত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সবসময়ই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। তবে গত এক দশকে এই মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের ভাষা ও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলেছে। কখনো দম্ভ, কখনো ভুল স্বীকারের সাহস, আবার কখনো বিতর্কিত সাফাই—সব মিলিয়ে জনমানসে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

১. আওয়ামী লীগ আমল: ওবায়দুল কাদেরের ‘রাজনৈতিক দম্ভ’
সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দীর্ঘ শাসনামল ছিল মূলত মেগা প্রজেক্টের প্রচার আর রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের সময়।

বক্তব্যের ধরন: তাঁর কথা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। বিরোধী দলকে “পাগলের প্রলাপ” বলা বা সাধারণ শিক্ষার্থীদের “রাজাকার” ট্যাগ দেওয়া তাঁর পরিচিত ভঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

জন-আকাঙ্ক্ষার বিচ্যুতি: সড়কে বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ উঠলে তিনি তা “ষড়যন্ত্র” বলে উড়িয়ে দিতেন। জনগণের ভোগান্তিকে সরাসরি স্বীকার না করে উন্নয়নের দোহাই দেওয়াই ছিল তাঁর মূল সুর।

২. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: ফাওজুল কবির খানের ‘জবাবদিহিতার সংস্কৃতি’
২০২৪-এর ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে টেকনোক্র্যাট উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বাংলাদেশের প্রশাসনিক ভাষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেন।
ব্যর্থতা স্বীকার: তিনি প্রথম নীতিনির্ধারক যিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে না পারা সরকারের “ব্যর্থতা”।

স্বচ্ছতার উদাহরণ: ভিআইপি প্রটোকল বর্জন, নিজের সম্পদের হিসাব প্রকাশ এবং সাধারণ মানুষের মতো মেট্রো রেলে যাতায়াত করে তিনি “জনসেবক” হওয়ার প্রকৃত দৃষ্টান্ত দেখান। এটি ছিল দম্ভের বিপরীতে চরম বিনয় ও স্বচ্ছতার প্রকাশ।

৩. বর্তমান তারেক রহমান সরকার: শেখ রবিউল আলমের ‘বিতর্কিত মন্তব্য ও দলীয় অস্বস্তি’
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ রবিউল আলম তাঁর কিছু বক্তব্যের কারণে দ্রুতই সমালোচনার মুখে পড়েন।
বিতর্কিত মন্তব্যসমূহ:

চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা: তিনি পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে “অলিখিত নিয়ম” এবং মালিক-শ্রমিকের “আপস” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যেহেতু এটি পারস্পরিক সমঝোতায় হয়, তাই একে অপরাধ বলা কঠিন।

যাত্রীদের ওপর দায় চাপানো: অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগকে “ভিত্তিহীন” দাবি করে তিনি বলেন, যাত্রীরা নাকি “সিট নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছায় বেশি টাকা অফার করছেন”।

বিএনপির দলীয় পলিসি ও ইশতেহারের অবস্থান:
মন্ত্রীর এই ব্যক্তিগত মন্তব্যের বিপরীতে বিএনপির দলীয় অবস্থান ও নির্বাচনী ইশতেহার ছিল অনেক বেশি কঠোর ও সংস্কারমুখী:
জিরো টলারেন্স অন এক্সটর্শন: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, পরিবহন খাতে কোনো প্রকার “পলিটিক্যাল লেভি” বা চাঁদা সহ্য করা হবে না। প্রতিটি রুটে স্বাধীন তদারকি সেল গঠন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যাতে নগদ টাকার লেনদেন ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়।
তারেক রহমানের কড়া বার্তা: মন্ত্রীর বক্তব্যের পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, “জনগণের পকেট কাটার কোনো সংস্কৃতিকে বিএনপি বৈধতা দেবে না”। তিনি অবিলম্বে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য স্বরাষ্ট্র ও পরিবহন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।
মহাসচিবের সতর্কবাণী: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, মন্ত্রীর ব্যক্তিগত বক্তব্য দলের মূলনীতির (ইশতেহার) প্রতিফলন নয়। বিএনপি “পরিবহন মাফিয়া” রাজত্বের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
কাদের বনাম রবিউল: ওবায়দুল কাদের যেখানে রাজনৈতিক আধিপত্য দিয়ে অনিয়ম ঢাকতেন, শেখ রবিউল আলম সেখানে অনিয়মকে (যেমন: চাঁদাবাজি) “স্বাভাবিক নিয়ম” বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। উভয় ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি গৌণ হয়ে পড়েছে।

ইশতেহার বনাম বাস্তবতা: বিএনপির ইশতেহারে চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবহনের স্বপ্ন দেখানো হলেও, স্বয়ং মন্ত্রীর মুখে একে “আপস” বলার মাধ্যমে ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় ধরণের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

উপসংহার
পরিবহন খাতের অস্থিরতা দূর করতে বড় বড় সড়কের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল একজন সংবেদনশীল নীতিনির্ধারকের। আওয়ামী লীগ আমলের “দম্ভ” আর বর্তমান মন্ত্রীর “বেফাস” মন্তব্যের ভিড়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সেই সংক্ষিপ্ত “জবাবদিহিতার সংস্কৃতি” আজ সাধারণ মানুষের কাছে বেশি কাঙ্ক্ষিত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও নীতিনির্ধারকদের চিন্তাধারা ও ভাষার পরিবর্তন না হওয়াটা জন-আকাঙ্ক্ষার পথে এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও খবর