রাজনীতি

“নতুন দল, নতুন স্বপ্ন এবং তারুণ্যের দ্রোহ”

  ৩ মার্চ ২০২৫ , ৫:১৫:১৪

নতুন দল, নতুন স্বপ্ন এবং তারুণ্যের দ্রোহ

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে। ওই দিন প্রধান দুটি রাজনৈতিক ধারার বাইরে বাংলাদেশে তারুণ্যের শক্তিতে নির্ভর একটি নতুন রাজনৈতিক দল  আত্মপ্রকাশ করেছে। এত বিপুল জনপ্রিয়তা ও আবেগ, ভালোবাসা নিয়ে এর আগে কোনো রাজনৈতিক দলের এমন বর্ণাঢ্য আত্মপ্রকাশের ঘটনা বিরল। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দলটির উত্থান যেমন ছিল অনিবার্য, তেমনি গণ-আকাঙ্ক্ষার স্বতঃস্ফূর্ত বহিপ্রকাশ।

প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে একটি নতুন স্বপ্ন এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে নতুন দলটির ঘোষণাপত্রে।  ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং তারুণ্যের  আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণ। তরুণরা বাংলাদেশকে যেভাবে দেখতে চায়, সে রকম একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের দায়িত্ব তাঁরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এ দায়িত্ব তাঁরা অন্য কারো ওপর দিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন না।

যে কারণে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ছিল অনিবার্য।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জুলাই বিপ্লব’ যেমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যেখানে মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে কিছু উদ্যমী অকুতোভয়, সাহসী তরুণ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অবশেষে স্বৈরাচারের নিগঢ় থেকে শত শহীদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ মুক্ত হয়। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পর তরুণরা যখন দেখলেন তাঁদের প্রত্যাশা এবং স্বপ্নগুলো আস্তে আস্তে ধূসর হয়ে যাচ্ছে, তাঁরা যে ধরনের বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ ক্রমশ পথ হারাচ্ছে।

তখন তাঁরা নিজেরাই দায়িত্ব তুলে নিলেন। এটি যতটা না রাজনৈতিক দল তার চেয়ে বেশি তরুণদের আকাঙ্ক্ষার প্ল্যাটফরম। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশের সব কিছুর অর্জন তারুণ্যের হাত ধরে।’আমাদের ভাষা আন্দোলন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সবশেষে জুলাই বিপ্লব—সব কিছু অকুতোভয় তারুণ্যের দ্রোহের বিজয়। কিন্তু অদ্ভুত একটি ব্যাপার হলো, গত শতকের আশির দশক থেকে আমাদের তরুণরা ক্রমশ নিজেদের রাজনীতি বিমুখ করে ফেলেছিলেন। ষাট বা সত্তরের দশকে আমরা যেমন লক্ষ করেছি, সব মেধাবী শিক্ষার্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্ররাজনীতির চর্চাকেন্দ্র, আগামীর রাজনীতিবিদ তৈরি হওয়ার সূতিকাগার, সেখানে আশির দশকে এসে অবস্থা পাল্টে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে তরুণরা লেখাপড়া, ভালো চাকরি, ব্যবসা, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়া বা বিদেশে গিয়ে চাকরি-বাকরি করে স্থিতু হওয়া—এ রকম একটি সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে পড়েন। এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় বাংলাদেশের। বন্ধ হয়ে যায় নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাইপলাইন। অযোগ্যরা রাজনীতিতে জড়ো হতে থাকে এবং তারাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। ফলে রাজনীতি হয়ে পড়ে মেধাহীন, মেধাশূন্য, দুর্নীতি, চাটুকারদের আখড়া।আবার এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আশির দশকে জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে তরুণ মেধাবীদের নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি তরুণ মেধাবীদের একসঙ্গে জড়ো করেছিলেন। হিজবুল বাহার জাহাজে তাঁদের বাংলাদেশ এবং আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য উদ্দীপ্ত করেছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সেই ধারা ব্যাহত হয়। নতুন রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্ররাজনীতিতে শক্তি, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে লিপ্ত হন। ফলে ছাত্ররাজনীতি হয়ে ওঠে পেশিশক্তি নির্ভর। ছাত্ররাজনীতির নামে মেধাহীন ছাত্রদের হল দখল, ক্যাম্পাস দখলের নোংরা খেলায় ব্যবহার করা হয়। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ও এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। এ রকম অবস্থায় বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের হাতে আগামীর নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে প্রায় বিলীন হয়ে যায়।বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন, চাটুকার, মোসাহেব এবং অযোগ্যদের প্রাধান্য বাড়তে থাকে। কিন্তু এ অবস্থার পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি ২০১৪ সালের পর থেকে। প্রথমে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীরা কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটান। হারিয়ে যাওয়া তারুণ্যের এক ঝলক দ্রোহ আমরা প্রত্যক্ষ করি। নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য তারা রাজপথে। কোটা আন্দোলন বাংলাদেশে ছাত্রদের শক্তি এবং তারুণ্যের দ্রোহকে নতুনভাবে প্রস্ফুটিত করে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে তরুণরা তাঁদের অধিকার আদায় এবং অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে শুরু করেন। ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের’ মাধ্যমে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকারের চেতনা সঞ্চালিত হয় নতুন করে। এটিও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আরেকটি নতুন মাইলফলক। যেখানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁদের দাবি আদায় করেছিলেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়তে থাকে। তাঁরা নতুন চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন এবং তাঁদের মধ্যে এক নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার দর্শন লক্ষ করা যায়। এই দর্শনটিই আসলে ‘জুলাই বিপ্লবের’ মূল প্রেরণা।অনেকে মনে করতে পারেন, ‘জুলাই বিপ্লব’ একটি ক্ষণিকের আবেগ। কোটা সংস্কারের দাবি মেনে না নিয়ে সরকারের একগুঁয়েমির ফলে ছাত্রদের যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের একটি অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন ছিল না। বরং একটি বৈষম্যমুক্ত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই তরুণরা সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন এবং এই সংঘবদ্ধ শক্তি এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। যে বাংলাদেশে বৈষম্য থাকবে না, পরিবারতন্ত্র থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না। যোগ্যতা এবং মেধার প্রকৃত মর্যাদা হবে। এ রকম একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই তরুণদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পর আমরা লক্ষ করি, তরুণদের সেই স্বপ্নগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সেই পুরনো আমলাতান্ত্রিক ধারা, সেই পুরনো ব্যবস্থাপনাতেই একটি রাষ্ট্র এগিয়ে চলছে। ফলে সর্বত্র থাকা ফ্যাসিবাদের নানা রকম সুবিধাভোগীরা বাংলাদেশের তরুণদের স্বপ্নকে প্রায় ছিনতাই করতে যাচ্ছিল। এ রকম পরিস্থিতিতে তরুণরা আবার নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁরা অনুধাবন করেন, একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে তাঁদের যে আকাঙ্ক্ষার সে আকাঙ্ক্ষার কখনো বাস্তবায়িত হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সনাতন পদ্ধতির বদলে একটি নতুন বিপ্লবের ডাক দিয়েছে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’। এই নাগরিক পার্টি সাফল্য অর্জন করতে পারবে কি পারবে না, সেটি ভবিষ্যৎ বলে দেবে। কিন্তু তরুণরা যে রাষ্ট্র বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত তার একটি বার্তা এই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হলো।বিশ্বজুড়েই নেতৃত্বের একটি সংকট চলছে। তরুণ নেতৃত্ব সামনে এগিয়ে আসতে পারছে না। বাংলাদেশের তরুণরা ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ গঠনের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে যেন জানান দিলেন, তরুণদের শক্তি এবং তরুণদের আকাঙ্ক্ষার পূরণে বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ এখন পথ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন নেতৃত্বের আসনে।

আমরা জানি, একটি রাজনৈতিক দল গঠন, তাকে বিকশিত করা, সারা দেশে সেই রাজনৈতিক দলকে প্রতিষ্ঠিত করা অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ একটি কাজ। বিশেষ করে বর্তমানে রাজনীতিতে যেভাবে কালো টাকা এবং পেশিশক্তি প্রবেশ করেছে, সেখানে একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ এবং বিকাশ খুব কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আমরা আশাবাদী হতে চাই। কারণ তরুণরা নতুন করে ভাবছেন এবং আগামীর বাংলাদেশ তাঁদেরই। এই বাংলাদেশকে তাঁদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে। কাজেই তাঁদের সামনে অনেক পথ। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তরুণরা ‘জুলাই বিপ্লবের’ মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁরা পারেন। এ কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া এভিনিউতে দেখা গেল জনস্রোত। শুরুতেই জনগণ তাদের ওপর আস্থা রেখেছে। জনগণ পরিবর্তন চায়। জনগণ এই আশাহীন, স্বপ্নহীন দেশকে এক জাগরণের বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চায়। আর এ কারণে তরুণদের ওপর তাদের আস্থা আছে, যার প্রমাণ ২৮ ফেব্রুয়ারি। কারণ তরুণরা এরই মধ্যে তাঁদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। ১৫ বছর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা যে স্বৈরাচারকে কেউ হটাতে পারেনি, তরুণরা তাঁদের সরিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁদের ঐক্যের শক্তি কত সমৃদ্ধ। আর এ কারণেই জনগণ আশা নিয়ে বুক বেঁধে আছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র আত্মপ্রকাশ মানুষকে আশান্বিত করেছে। চারদিকে যখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সবদিকে যখন ব্যর্থতা, হতাশার ছায়া, ঠিক তখন এই রাজনৈতিক দলটি মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

তবে মনে রাখতে হবে, চটজলদি রাজনীতিতে কিছু অর্জিত হয় না। আত্মপ্রকাশের পর তাঁদের নিয়ে সমালোচনা হবে। তাঁদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। অনেকে তাঁদের কর্মসূচি, নীতি এবং বক্তব্যের সমালোচনা করবেন। এই সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা নতুন দলের থাকতে হবে। আর দলের কাজে থাকতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। মানুষ যেন বিশ্বাস করে এই দলটি অন্য রাজনৈতিক দলের মতো না। এসব যদি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিকারের গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে জাতীয় নাগরিক পার্টি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি ক্ষমতায় আসবে কি না সেটি জনগণ নির্ধারণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান যে গতিধারা তা যে তারা বদলে দেবে সেটা হলফ করে বলা যায়।

আরও খবর