অর্থনীতি

পরিবেশের দোহাই না কি সুকৌশলী ‘গ্রিনওয়াশিং’? আড়ংয়ের ব্যাগ বিতর্ক ও গ্রাহক অধিকার

  একুশ প্রতিবেদন ১৫ মার্চ ২০২৬ , ৩:২৭:১৯

পরিবেশের দোহাই না কি সুকৌশলী ‘গ্রিনওয়াশিং’? আড়ংয়ের ব্যাগ বিতর্ক ও গ্রাহক অধিকার

জাহান হাসান
বিলাসী কেনাকাটা বনাম সাধারণ গ্রোসারি অভিজ্ঞতা
সাধারণত মানুষ কাঁচাবাজার বা গ্রোসারি শপে যাওয়ার সময় বাসা থেকে ব্যাগ নিয়ে যেতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। কিন্তু আড়ং-এর মতো একটি প্রিমিয়াম লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডে কেনাকাটা কেবল পণ্য কেনা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শপিং অভিজ্ঞতা’। হাজার হাজার টাকার পোশাক বা শৌখিন সামগ্রী কেনার পর যখন হাতে করে পণ্য নিয়ে বের হতে হয় অথবা নামমাত্র ব্যাগের জন্য আলাদা করে টাকা গুনতে হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে। প্রশ্ন জাগে—গ্রাহকের প্রতি এই আচরণ কি আদতে পরিবেশ রক্ষা, না কি নিয়ম চাপিয়ে দিয়ে গ্রাহককে অসম্মান করা?
সাবলিমিনাল ব্র্যান্ডিং ও নেগেটিভ পিআর-এর খেলা
আড়ং তাদের প্রচারণায় দাবি করছে যে, ৭০০টি কাগজের ব্যাগ তৈরি করতে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কাটতে হয়। তাই তারা ব্যাগের ওপর চার্জ আরোপ করে গ্রাহককে নিজস্ব ব্যাগ আনতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের সাবলিমিনাল (Subliminal) প্রমোশন। যখন সাধারণ গ্রোসারি শপের মতো আড়ংও ব্যাগ নিয়ে কড়াকড়ি করে, তখন তারা পরোক্ষভাবে প্রচার করে যে তারা অত্যন্ত আদর্শবাদী। এই বিতর্ক বা নেগেটিভ পিআর আড়ংকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখছে, যা আধুনিক মার্কেটিংয়েরই একটি চতুর অংশ।
চার্জ বনাম ব্র্যান্ডিং: গ্রাহক যখন বিজ্ঞাপনের বাহক
একজন ক্রেতা যখন আড়ংয়ের লোগোযুক্ত ব্যাগ বহন করেন, তিনি আসলে ব্র্যান্ডটির বিনামূল্যে বিজ্ঞাপন করছেন। অথচ সেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমটির (ব্যাগ) জন্যই যখন ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি ৫ বা ১০ টাকা নেওয়া হয়, তখন তা নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন করে। বড় ব্র্যান্ডগুলোর আভিজাত্য বজায় রাখার অন্যতম শর্ত হলো গ্রাহক সেবা। ব্যাগের টাকা আলাদা করে নেওয়া সেই আভিজাত্য আর আস্থার জায়গাটায় ফাটল ধরাচ্ছে।
গ্রিনওয়াশিং’ ও ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন
পরিবেশের দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়কে বিশ্বজুড়ে ‘গ্রিনওয়াশিং’ (Greenwashing) বলা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ‘পরিবেশের উন্নতির’ কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ নেয় কিন্তু সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার বা স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে, তবে তা প্রতারণার শামিল। আড়ং দাবি করছে ব্যাগের টাকা বৃক্ষরোপণে ব্যয় হবে, কিন্তু এই হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ভোক্তা অধিকারকর্মী ও আইনজীবী। আইনের দৃষ্টিতে, তথ্য গোপন করে বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা ভোক্তা অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হতে পারে। অনেক দেশের আদালতেই বড় ব্র্যান্ডের লোগোযুক্ত ব্যাগের দাম নেওয়াকে ‘অন্যায্য বাণিজ্যিক চর্চা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।বিকল্প ও সমাধান: দায় কার?
আড়ং বর্তমানে বাসা থেকে ব্যাগ আনা ক্রেতাদের ১৫ টাকা ক্যাশব্যাক দিচ্ছে, যা প্রশংসনীয় হলেও ব্যাগের অপ্রাপ্যতা বা চার্জ নিয়ে ক্ষোভ কমছে না। পরিবেশ রক্ষা তখনই সফল হবে যখন তা গ্রাহকের ওপর ‘বোঝা’ হয়ে চাপবে না। বৃক্ষরোপণের মতো কাজগুলো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব CSR (Corporate Social Responsibility) ফান্ড থেকে হওয়া উচিত, গ্রাহকের পকেট কেটে নয়। নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে গ্রাহকের ন্যূনতম সম্মান আর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাই প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব।


হ্যাশট্যাগ: #Aarong #ConsumerRights #Greenwashing #ShoppingExperience #EnvironmentProtection #Bangladesh #StopChargingForBags

আরও খবর