অর্থনীতি

প্রত্যাবর্তন ও রূপান্তর: গ্লোবাল ট্যালেন্টের হাতে বাংলাদেশের স্টার্টআপ বিপ্লব

  একুশ প্রতিবেদন ২০ মার্চ ২০২৬ , ১২:৪৭:৫৩

প্রত্যাবর্তন ও রূপান্তর: গ্লোবাল ট্যালেন্টের হাতে বাংলাদেশের স্টার্টআপ বিপ্লব

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের বড় একটি অংশ বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা ক্যারিয়ারের জন্য গিয়ে সেখানেই স্থায়ী হতেন। কিন্তু গত এক দশকে এই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সিলিকন ভ্যালি থেকে লন্ডন—বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি হাবের অভিজ্ঞতা নিয়ে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ এখন দেশের মাটিতেই গড়ে তুলছেন বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান। এই ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধাপাচার রোধের ইতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করেছে।

১. স্বপ্ন যখন নিজের মাটিকে ঘিরে

পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত জীবন ছেড়ে দিয়ে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এখন বাংলাদেশে ফিরছেন। তাদের উদ্দেশ্য কেবল ব্যবসা করা নয়, বরং উন্নত বিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের মৌলিক সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান তৈরি করা। এই প্রত্যাগত উদ্যোক্তারা কেবল পুঁজি নয়, সাথে করে নিয়ে আসছেন আন্তর্জাতিক মানের কাজের সংস্কৃতি (Work Culture) ও নেটওয়ার্ক।

২. বিশেষায়িত খাত ও রূপান্তরের কারিগর

প্রত্যাগত মেধার স্পর্শে বাংলাদেশের কয়েকটি বিশেষ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে:

ফিনটেক (FinTech): আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে এই খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। বিকাশ (bKash)-এর মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়াও শপআপ (ShopUp) বা ডানা (Dana)-এর মতো স্টার্টআপগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রাপ্তি সহজ করছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্টার্টআপ বিনিয়োগের সিংহভাগই আসছে ফিনটেক খাত থেকে।

এগ্রিটেক (AgriTech): কৃষিকে আধুনিক করতে আই-ফার্মার (iFarmer) বা উইগ্রো (WeGro)-এর মতো প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ফাহাদ ইফাজদের মতো উদ্যোক্তারা আইওটি (IoT) ও ডেটা সায়েন্স ব্যবহার করে কৃষকদের সরাসরি বাজার ও বিনিয়োগের সাথে যুক্ত করছেন।

হেলথ-টেক (HealthTech): দেশের স্বাস্থ্যখাতে আস্থা ফেরাতে হার্ভার্ড বা পশ্চিমা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদাররা প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। প্রাভা হেলথ (Praava Health) আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সেবা দিচ্ছে, আর আরোগ্য (Arogga) বা মেদইজি (MedEasy) ঘরে বসে ওষুধ ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিশ্চিত করছে।

লজিস্টিকস ও এডটেক: পাঠাও (Pathao) বা চালডাল (Chaldal)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে। অন্যদিকে, শিখো (Shikho) ও ১০ মিনিট স্কুল-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো গ্লোবাল লার্নিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে।

৩. কেন তারা ফিরছেন এবং সফল হচ্ছেন?

বিশাল বাজার সম্ভাবনা: ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজার এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা নতুন ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণ: উন্নত বিশ্বের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা তারা নিজেদের কোম্পানিতে বাস্তবায়ন করছেন, যা কর্মীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করছে।

সামাজিক দায়বদ্ধতা: দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কৃষির মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের এক ধরনের তাড়না তাদের ফিরিয়ে আনছে।

৪. চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ

বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই মেধাবীদের জন্য পথটি মোটেও মসৃণ নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাইসেন্সিংয়ের দীর্ঘসূত্রতা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওঠানামা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে সরকারি সংস্থা ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর সরাসরি মূলধন সরবরাহ এবং হাই-টেক পার্কগুলোর সুযোগ-সুবিধা এই পথকে কিছুটা সহজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও স্টার্টআপ লোনের সীমা বাড়িয়ে এবং সুদের হার কমিয়ে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশের এই গ্লোবাল ট্যালেন্টদের ফেরা কেবল অর্থনীতির সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন নয়, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। তারা প্রমাণ করছেন যে, প্রতিকূলতার মাঝেও সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় থাকলে নিজ দেশেই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব।

আরও খবর