ফেসবুকের পাতা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ , ৫:৪৬:০৯
বাংলাদেশের মানুষদের একটা কমন স্বভাব – বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে কমন স্বভাব হোলো এইরকম:
আপনি একটা লোককে অপছন্দ করেন কিংবা তার কথা বুঝলেন না। কিংবা তার একটা কথা আপনাকে ব্যাথা দিয়েছে বা আপনার বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সাথে সাথে ট্যাগ দিলেন – সে তো ইন্ডিয়ার লোক। কিংবা সিআইএ’র লোক। কিংবা পাকিস্তানের লোক। আমি দেখেছি যে নুনুডাঙ্গা গ্রামের ছাপড়ি সংঘের সহ-সভাপতি – কিন্তু কে কোন দেশের এজেন্ট – এ ব্যাপারে তার জ্ঞান উইকিপিডিয়ার চাইতেও বেশী।
এই কাজটা করবেন না প্রথমত এইজন্যে যে আপনাকে সবাই উইক ম্যান হিসাবে দেখবে। প্রথম দিন দেখবে না কিন্তু শেষমেশ দেখবে। কারণ আপনি আসলেই উইক। এই যেই কাজটা আপনি করেন – তার আসল কারণ হোলো হিংসা। ও কেন খাবে – আমি কি ওর চেয়ে ভালো না? আমার ধারণা বাঙালির বিশ্ববীক্ষণের প্রথম লাইনের যে প্রশ্নগুলো সারাদিন খোঁচা দেয়, অস্বস্তি উৎপাদন করে – উপরের প্রশ্নটি অন্যতম।
বাঙালি অপরকে ছোটো করে যে স্বস্তি পায় – সে আনন্দ তুলনারহিত। সমস্যা হোলো যে মডার্ন কমপ্লেক্স সমাজে, অপরকে ছোটো করার কাজটা সহজ না। মূলত দূরত্বের কারণে। যেমন ধরেন যে আপনি নুনুডাঙ্গা গ্রামের একজন মাঝি। আমাকে দেখলেই আপনার মাথায় আগুন ধরে যায়। সমস্যা হোলো যে ৫০০ বছর আগে – এই স্থিতিটা সম্ভব ছিলো না। মানে তখনও আপনার রাগ ও হিংসা ছিলো – কিন্তু যার প্রতি রাগ ও হিংসা কাজ করতো – সে আপনার হদের ভিতরেই থাকতো। হাজার মাইল দূরের একটা মানুষকে রাগ ও হিংসা করা সম্ভব ছিলো না। আপনি তাকে চিনতেনই না।
এখন আমাকে আপনার অনেক অপছন্দ কিন্তু এই অপছন্দকে যে নতিজা দিতে পারছেন না – এটাই আসলে মূল সমস্যা। যেহেতু আপনি নুনুডাঙ্গা গ্রামের মাঝি সেহেতু আপনার বেস্ট অপশন হোলো গালি ও ট্যাগ। আপনি যদি একটু সতর্ক হন – আপনি দেবেন ট্যাগ আর আপনি যদি যদি একেবারেই নাখাস্তা হন – ভাত খাওয়ার আগে কচলে পাছা চুলকানো টাইপ নাখাস্তা – আপনি দিবেন গালি।
এতে আপনার আনন্দ হবে সত্য – কিন্তু লং টার্মে এই প্রবণতা আপনাকে আরো দুর্বল ও ভালনারেবল করবে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই? দেখলাম যে একটি মানিকজোড় ফোটোকার্ডে বলা হচ্ছে যে ওয়াকার সাহেব বলছেন দ্রুত নির্বাচনের কথা এবং ইন্ডিয়ান চীফ বলছেন ইলেক্টেড গভমেন্টের কথা। ব্যাস! প্রমাণ হয়ে গেলো যে ওয়াকার সাহেব ইন্ডিয়ান এজেন্ট। এই ফোটোকার্ডকে আরেকজন বলছেন দালিলিক প্রমাণ।
……………………….
আপনি যতো সংস্কারের কথাই বলেন – যা ইচ্ছা তাই করেন – নির্বাচন আপনি বেশীদিন আটকে রাখতে পারবেন না। এর কারণ রাজনৈতিক না – অর্থনৈতিক। সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন। বালটাও ছিড়তে পারবেন না। বিএনপি যদি এই মুহূর্ত থেকে বলে যে নির্বাচন ২০২৬ এর শেষে চাই – তাহলেও কিছু ছিড়বে না। এর কারণ বাংলাদেশে ইনভেস্টমেন্ট আসবে না যতোক্ষণ না আমরা নরম্যালসির দিকে ফেরত না যাই। আপনার পরিচিত যেকোনো বড় ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞেশ করেন – প্রত্যেকে দ্রুত নির্বাচন চান। এরা কি সবাই বিএনপি? এবসোলিউটলি নট। কিন্তু বিজনেসের জন্য মার্কেট কনফিডেন্স লাগবে এবং সেটা পলিটিকাল গভমেন্ট না আসলে হবে না। এটাই বাস্তব। (BTW – আমি ইঙ্গিত করছি না যে বিএনপি সরকারে আসবে বা আসা উচিত। কিংবা বিএনপি আসলেই সব সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিংবা বিএনপি এই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম) কিন্তু এটা অবশ্যই বলছি যে পলিটিকাল গভমেন্ট ছাড়া – সেটা যেই আসুক – মার্কেট কনফিডেন্স ফিরবে না।
রাজনৈতিক চাপ – আপনি গুটিবাজি করে, সন্ত্রাস দিয়ে আটকাতে পারবেন – কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ আপনি আটকাতে পারবেন না। ছেড়াবেড়া হয়ে যাবে। আমরা যদি ম্যাসিভ লেভেলে এমপ্লয়মেন্ট ক্রিয়েট করতে না পারি আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে – লিখে রাখতে পারেন – যারা আমরা এখন লম্বা লম্বা কথা বলছি আমাদের প্রত্যেকের গোমাসা হবে।
আজকে বাংলাদেশের যে টালমাটাল অবস্থা – এর কারণও অর্থনৈতিক। মার্কেটে জব নাই; টাকা নাই।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের সব ডিসিশান মেকাররা বোঝে। আদিলুর রহমান শুভ্র হয়তো বোঝেন না (বা বুঝতে চান না) – বাকীরা ঠিকই বোঝেন। সেই বাস্তবতার আলোকে ওয়াকার সাহেব যদি বলেন দ্রুত নির্বাচনের কথা – তিনি আমার মনে হয় ইন্ডিয়ার স্বার্থ দেখছেন না – বাংলাদেশের স্বার্থই দেখছেন।
কিন্তু বাঙালি কার্য-কারণের সরলতম ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না। অকাম’স রেজার দিয়ে বাঙালি অকামের নুনু কেটে দিবে। তার চাই গল্প। এই গল্প কে বলবে? এই আমরা যারা ফেইসবুক-য়ুটিউব করি।
এখন না, বহু আগে থেকেই আমি বিশ্বাস করি না যে বাংলাদেশে RAW এর এজেন্ট আছে। ভারতপন্থী লোক হাজার হাজার আছে, কিন্তু তারা এজেন্ট না। RAW এর এজেন্ট মানে তো RAW আমাকে টাকা দিবে – আর বদলে আমি কিছু সার্ভিস দিবো – তাই তো?
একচুয়ালি ঘটনা ঘটেছে ঠিক উল্টা। ১০০% উল্টা। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের এজেন্ট ছিলো ভারতীয়রা। টাকাটা দিয়েছে আওয়ামী লীগের লোকরা। সেই টাকাও তাদের নিজের না – আপনি ভবিষ্যতে যেই টাকা আয় করে ট্যাক্স দিবেন কিংবা টোল – সেই টাকা আওয়ামীরা পাঠিয়েছে ইন্ডিয়ায়। যেসব ফকির-মিসকিন কিছু সুবিধা পেয়েছে (যেমন সমকালের চাকরি বা গভমেন্টের ব্যবসা বা হ্যান্ডআউট) – সেগুলোও আরেক আওয়ামী থেকে টোকায় তারপর দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজে এই দাক্ষিণ্যকে ইন্ডিয়ার দাক্ষিণ্য বলে কল্পনা করার একটা রেওয়াজ আছে। পূজারী মন আমাদের। কী করবেন বলুন? দাক্ষিণ্য যতো দূরত্ব ও যতো বিশালত্ব থেকে আসে – সেই দাক্ষিণ্যের মর্তবা ততো বেশী। হাসান মাহমুদের কুত্তা থেকে ইন্ডিয়ার কুত্তা – শুনতে একটু বেটার লাগে।
এই টাকার বদলে ভারতীয়রা আওয়ামী লীগকে সার্ভিস দিয়েছে। সত্য হোলো যে আওয়ামী লীগের দেয়া টাকার বদলে ভারতীয়রা আওয়ামী লীগকে সার্ভিস দিয়েছে। উল্টোটা হয় নাই। পয়সা পশ্চিম থেকে পূর্বে আসে নি। আমরা পাঠিয়েছি পশ্চিমে।
আপনার জন্য গোমাসা – আরেকজনের জন্য ঐটা সেক্স।
কিন্তু বাংলাদেশের ছাগল-পাগলরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না। আমাদের নিজেদের গোমাসা হয়েছে – এই ব্যাখ্যায় আমাদের রাগ হয় না। রাগ হয় কিসে? ও কেন RAW এর টাকা পাবে? কোন লেভেলের মূর্খ হলে একজন ভাবতে পারে যে একজন ইন্ডিয়ান (কিংবা চাইনিজ) – এমনি এমনিই কাওকে বাকীতে টাকা দিবে – আমার বুঝে আসে না। ভাই ওরা টাকা দেয় নাই। আপনি দিয়েছেন – ওদের। বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার শোষণ এতোটাই সফল যে ছাগলরা এটাও বোঝে না – কে কাকে টাকা দিয়েছে।
বাকী থাকে ট্যাগিং এর আনন্দ। আমি এদেরকে উইক মনে করি এইজন্যে যে যারা ট্যাগিং করেন তাদের প্রায় কেউই কন্সিস্টেন্ট না। একেকদিন একেক কথা বলেন। অনেকেই ভাড়া খাটেন। ফলে আপনি আপনার সোশ্যাল ক্যাপিটাল খোয়ায় দেন। আপনাদের মনে আছে যে আগের দিনে এমন অনেক লোক ছিলো (বিশেষ করে বিএনপির) যারা প্রতিদিন তিনবার আওয়ামী সরকারকে ‘ফালায়’ দিতো। আমি তাদের সদিচ্ছাকে রেস্পেক্ট করি – কিন্তু তাদের কথা তখনো সিরিয়াসলি নিতাম না, এখনো নেই না। তারা মনে করতেন যে তারা এক্টিভিস্ট কিন্তু কখন যে তারা এক্টিভিস্ট থেকে এন্টারটেইনার হয়ে গেছেন – এই খবরও তাদের নাই।
যদি আপনার কিছু অপছন্দ হয় – ইভেন্টটাকে বোঝার চেষ্টা করেন, কার্যকারণ বোঝার চেষ্টা করেন। এক্টরকে না বুঝলেও হবে। কিংবা পরে বোঝার চেষ্টা করুন। যখন কার্যকারণ বুঝবেন – দেখবেন যে ভাত খাওয়ার আগে আপনার আর কচলে পাছা চুলকাতে হচ্ছে না।