Zadhid Ahmed Powell ৮ মার্চ ২০২৫ , ১২:৫৭:১২
!! হাতে সময় থাকলে অবশ্যই পড়িয়েন !!
BUET, CUET, RUET, KUET, SUST, IUT, DUET, AUST, BRAC, NSU সহ বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছাত্ররা যে বিমান কোনদিন বানাতে পারে নাই, মানিকগঞ্জের জুলহাস সে বিমান বানিয়ে আকাশে উড়িয়েছেন!
১০০/১৫০ বছর আগের গ্লাইডার টেকনোলজি ফলো করে বানানো বিমান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ লেভেলের ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টরা বানাতে পারেন নাই আজ পর্যন্ত!
কিন্তু জুলহাস বানিয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই!
তো আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারদের পড়াশোনার মান কি তাহলে এতই খারাপ যে একটা সাধারণ গ্লাইডার বিমান বানাতে পারেন না?
এরকম চিন্তা ভাবনা যদি করে থাকেন, কিংবা মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে একটু পড়ুন।
টেকনোলজিতে আমরা সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাই Scaling নিয়ে।
এই স্কেইলিং ব্যাপারটা হচ্ছে একটা সিস্টেম দিয়ে কিভাবে একজন থেকে ১০ জন, তারপর এক হাজার জন থেকে ১ লাখ জনকে সার্ভিস দেয়া যায় সমান এফিশিয়েন্সি এবং পারফরমেন্স ধরে রেখে।
ব্যাপারটা মনে করেন বাসায় ১০ জনের জন্যে রান্না করা আর অনুষ্টানে ৫০০ জনের জন্যে রান্না করার মতন।
আপনার আম্মা বাসায় ১০ জনের জন্যে রান্না করতে পারেন অনায়াসে কিন্তু ৫০০ জনের রান্না উনি করতে যাবেন না। ৫০০ জনের রান্নার জন্যে বাবুর্চি আনতে হবে। এই বাবুর্চি যা করবেন সেটাই স্কেইলিং।
কারণ বাবুর্চি জানেন কিভাবে স্কেইল করতে হয়। উনি উনার সাথে আরও কাজের মানুষ নিয়ে আসবেন। কেউ কুটবেন, কেউ বাঁছবেন, কেউ মাপবেন। মাইক্রো ডিপার্টমেন্ট করে কাজ ভাগ করে দেবেন।
টেকনোলজি অনেক আগে থেকেই মাইক্রো ফেইজে আছে, এখন তো ন্যানো ফেইজেই চলে গিয়েছে।
এখন আর কেউ একটা পুরো সিস্টেম বানায় না। পুরো সিস্টেম বানানোর ব্যাপারটা অনেকটা আদিম যুগের টেকনোলজি। ম্যাটেরিয়াল এবং রিসোর্সের অপচয়।
এই যে বিমানের কথা বলেন। পৃথিবীতে মাত্র ৪ টা দেশ প্যাসেঞ্জার বিমানে ব্যাবহৃত জেট ইঞ্জিন বানাতে পারে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং রাশিয়া।
মানে আপনি তাবৎ পৃথিবীর আকাশে যত হাজার হাজার বিমান দেখেন তার ইঞ্জিনগুলো মাত্র এই ৪ টা দেশের কেউ না কেউ বানিয়েছে।
এমনকি টেকনোলজি বর্তমান রাজা চায়নাও একটা জেট ইঞ্জিন বানাতে পারে নাই। তারা এখনও রাশিয়ান ইঞ্জিন রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে একটা ইঞ্জিন বানানোর মতলবে আছে।
তবে কেন পারেন না তারা?
চায়নায় স্কুলের বাচ্চারা একজন দু’জনের বিমান থেকে শুরু করে Fighter Plane এর RC ভার্সন করে ফেলেছে!
তাহলে চায়না তাদেরকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে কেন বানাতে দেয় না বড় বিমান?
এর মূল কারণ হচ্ছে Scaling ইস্যু!
একজন থেকে দু’জন গেলেই বিমান উড়তে প্রয়োজনীয় লিফট, ড্র্যাগ, গ্র্যাভিটি এবং থ্রাস্ট এগুলোর অবিশ্বাস্য পরিবর্তন হয়।
এত কিছু আমি নিজেও জানি না। তবে এতটুক বলতে পারি চায়না যদি টেকনোলজির কোন কিছুতে ফেইল মারে, সেখানে অবশ্যই বিরাট খরচাপাতির গেঞ্জাম আছে!
যাই হোক, আবারও মাইক্রোতে ফেরত আসি।
Boeing এক একটা বিমান বানাতে ওরা ৮-৯ টা দেশের ২৫০+ সাপ্লায়ার কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ৬০ লাখ+ আলাদা আলাদা পার্টস বানিয়ে আনে!
এসব একেকটা কোম্পানিতে ৫০০-১০০০+ টপ ক্লাস ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করেন। কোন কোম্পানি শুধু একটা স্পার্ক প্লাগ বানায়, একটা থ্রাস্টার বানায়, কেউ বানায় সেন্সর, অথবা কেউ বানায় ক্ল্যাম্প, সবমিলিয়ে এরকম ৬০ লাখ+ পার্টস।
ঠিক এসব জায়গায় কাজে আসে গোটা দুনিয়ার ফিজিসিস্ট, ম্যাথমেটিশিয়ান এবং তারপর ইঞ্জিনিয়াররা। যাদেরকে আমরা মনে করি আপাত দৃষ্টিতে কিছুই করছেন না!
একজন ফিজিসিস্টের একটা থিওরি কোন ম্যাথমেটিশিয়ান ক্যালকুলেশন করে প্রমাণ করলে সেটা কোন ইঞ্জিনিয়ারের হাত ধরেই ম্যানুফ্যাকচার হয়।
নিউটনের গতির সূত্র, যেগুলো ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে চাপা ভেঙে ফেলসিলাম, নিউটন এগুলো আবিস্কার না করলে Wright Brothers বিমান বানাতে পারতেন না।
তাহলে এই যে আজকে বিমানে চড়ে দেশ বিদেশ ঘুরেন, এখানে স্যার আইজ্যাক নিউটনকে ক্রেডিট না দিয়ে যাবেন কই?
রন্টজেনের মতন পাগলাটে পদার্থবিজ্ঞানী যদি Cathode rays নিয়ে পাগলামি ন করতেন তাহলে X-rays আবিস্কার হত না।
চিন্তা করতে পারেন গোটা পৃথিবীর চিকিৎসা ব্যাবস্থ্যা X-rays ছাড়া?
আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করা ইঞ্জিনিয়াররা দুনিয়ার নানা কোম্পানিতে এসব মাইক্রো এবং ন্যানো টেকনোলজি নিয়েই কাজ করেন।
৭০-৮০% টপ কোয়ালিটির ইঞ্জিনিয়ার বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায় কারণ আমাদের দেশে এরকম কিছুই করা সুযোগ নেই!
বিদেশে উনারা কেউ রিসার্চ করেন আবার কেউ ম্যানুফ্যাকচারিং এর কাজ করেন।
তাদের কোন কোম্পানির বানানো একটা সেন্সর হয়তো বিমানে যাচ্ছে, রকেটে যাচ্ছে, স্পোর্টস কারে যাচ্ছে। এগুলা খুব ছোট ছোট জিনিস এবং আপনি জানবেনও না কোনটা কোন কাজে, কোনদিকে যাচ্ছে।
আজকের মাইক্রো টেকনোলজির পৃথিবীতে আপনি একা কোন কিছু বানিয়ে নেয়ার সুযোগ খুব একটা নেই। সর্বোচ্চ কোম্পানির CEO হলে আপনি একটা ফোকাস পয়েন্টে আসতে পারেন। যেমন ধরেন Elon Musk!
এখন ইঞ্জিনিয়াররা চাইলেই এরকম বিমান বানিয়ে উড়ানোর মতন কাজ করে এটেনশন নিতে পারেন সোশাল মিডিয়াতে। কিন্তু এই বানানোর ফজিলত শুধু বাংলার মাটিতেই।
দুঃখজনকভাবে এর কোন কমার্শিয়াল ভ্যালু নাই। এইটা ১০০ বছর আগের টেকনোলজি। The world has seen enough of it, and it’s about to be archived, if not already.
ড্রোনই যেখানে পুরাতন টেকনোলজি হয়ে যাচ্ছে, সেখানে বিমান কে বানাতে যাবে?
আমার জুলহাসের ব্যাপারে কোন ডিজরেসপেক্ট বা মাথাব্যথা নাই। He is a man of passion, and he has cultivated it!
তার শখের জিনিস সে বানাইসে। সে যদি আরও পড়াশোনা করতে পারতো, জানতে পারতো, তাহলে তার এই ব্যাপারটা আরও ভাল হত।
কিন্তু, এইটা শখ! সেটা মাথায় রাখতে হবে।
পৃথিবী এই গ্লাইডার টেকনোলজি গত ১০০ বছর ধরে চর্চা করে এখন জাদুঘরে রেখে দিয়েছে। ইউটিউবে সার্চ করেন, দেখবেন শত শত ভিডিও আছে বাচ্চা ছেলেপেলে এসব বানাচ্ছে।
বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টরাও শখে শখে অনেক কিছু বানিয়েছেন। কিন্তু তারা শিক্ষিত বলে তাদেরটা আলোচনা হয় না। এরকম শত শত উদাহরণ দেয়া যাবে।
আমাদের নিজেদের দেশে, লোকাল ইঞ্জিনিয়ারদেরকে দিয়ে বানানো বিমান বাহিনীর দু’টো ট্রেনিং বিমান আছে BBT1 এবং BBT2।
জানতেন আপনারা?
কমেন্টে দিলাম। দেখে নিয়েন।
আরও ৩-৪ বছর আগেই এগুলো বানানো হয়েছে। আলাদা আলাদা দুজন পাইলট সেগুলো একই ককপিটে বসে চালাতেও পারে। এমনকি মিসাইলও মারতে পারে প্রয়োজনে!
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আগেই Brac উনিভার্সিটির তিনজন স্টুডেন্ট জাপানের KYUTECH এর সহযোগিতায় নিজেরাই ন্যানো স্যাটেলাইট “অন্বেষা” বানিয়ে মহাকাশে পাঠিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের এক বছর আগে Space X এর Falcon-9 রকেটে চড়েই সে স্যাটেলাইট মহাকাশে গিয়েছে।
উনারা একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তাই কেউ খুব একটা পাত্তা দেয় নাই। আর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে যে প্রচারণা চলছিল। No wonder why they couldn’t get some attention!
কোভিডের সময় OxyJet ভ্যন্টিলেটর তৈরি করেছে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ২০-৩০ লাখ টাকার ICU ভ্যান্টিলেটর মাত্র ২৫ হাজার টাকায় বানিয়েছে। এই ভ্যান্টিলেটর এখন গ্লোবাল দুইটা কম্পিটিশন জিতে এখন প্রোডাকশনে।
বাংলাদেশে জন্ম এবং ১৮ বছর পর্যন্ত বড় হওয়া রবিন খোদা এখন এশিয়ার সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টার কোম্পানি AirTrunk এর প্রতিষ্টাতা।
যে AirTrunk উনি রিসেন্টলি বিক্রি করে দিয়েছেন মাত্র দুই লাখ পাঁচ হাজার তিনশো ত্রিশ কোটি টাকায়!
টাকার অংকটা আরও দুইবার পড়েন!
ঢাকা কলেজের সাবেক ছাত্র জাহিদ হাসান এখন বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন। উনি এখন পড়াচ্ছেন MIT তে!
খুব সম্ভবত উনি কয়েক বছরের মধ্যে নোবেল পেতেও যাচ্ছেন কোয়ান্টাম ফিজিকস এবং কোয়ান্টাম টপোলজিতে উনার রিসার্চের কারণে।
এখন উনি নোবেল পেলেও কি আর না পেলেও কি।
কারণ এই দেশে এটেনশন পেতে গেলে বিমান উড়ালে কিংবা হেলিকপ্টার বানালেই হবে না। তার সাথে গরীব, অশিক্ষিত কিংবা Non Privileged হতে হবে মানুষের মন জয় করতে!
শিক্ষিত বা Privileged লোকেরা কোন এক কারণে এখনও এই দেশের মানুষের চক্ষুশূল। কেন জানি সাধারণ মানুষ মনে করে শিক্ষিত বা বড়লোক মানেই খুব খারাপ।
এরা একদম বাজে। এদের গুনাতেই ধরা যাবে না। এরা সব চোর বাটপার!
এই কারণেই এই দেশের মানুষজনের বিজ্ঞান কিংবা টেকনোলজি জ্ঞ্যান এখনো নবম দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান মেলায় করা প্রজেক্ট পর্যায়ে রয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি বলতে এই স্ট্রিট নলেজকেই বোঝে এই দেশের ৯৯% মানুষ।
১৭ বছর আগের একটা মজার ঘটনা দিয়ে শেষ করি।
স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় আমার কয়েকটা বন্ধু (নাম বলবো না ওরা যদি কমেন্টে বলে, তাহলে ওকে) ইউরিন (প্রস্রাব) বোতলে ঢেলে এনোড এবং ক্যাথোড কানেক্ট করে একটা ব্যাটারির মতন বানিয়েছিল।
এই “মুতের ব্যাটারি” (আমরা নাম দিয়েছিলাম) দিয়ে একটা LED লাইট জ্বলতো।
আমার মনে আছে পুরো স্কুলে খুব আলোড়ন হয়েছিল এই “মুতের ব্যাটারি” নিয়ে। আমরা দেখতে গেলে ফাজলামি করে বলেছিল “মামা, বোতলটায় একটু মুইতা যা! চার্জ দরকার ব্যাটারিতে!”
তো এইটা “মুতের ব্যাটারি” খুব ব্যাতিক্রম একটা জিনিস। খুবই মজার এবং ইউনিক একটা কনসেপ্ট ক্লাশ নাইন টেনের বাচ্চাদের জন্যে। আমাদের জন্যেও ছিল।
কিন্তু যদি আপনি এইটাকে স্কেইল করতে চান। মনে করেন আমার ৬৫০ ওয়াটের কম্পিউটারটাকে যদি এক ঘন্টা চালাতে চাই এই “মুতের ব্যাটারি” দিয়ে, তাহলে ধরেন লাগবে ৪ থেকে ৬ লাখ লিটার প্রস্রাব!
এখন কি আমি এক ঘন্টা কম্পিউটার চালানোর মতন Scale করার জন্যে পুরা শহরের সব মানুষের বাথরুমের সাথে ব্যাটারির লাইন করে দেব?
লেখা: Zadhid Ahmed Powell