মতামত

যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে

  বাংলাদেশ প্রতিদিন ৩ এপ্রিল ২০২৫ , ৯:৪৭:০৬

যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে

মন্জুরুল ইসলাম

‘যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে’-এটি একটি শ্রোতাপ্রিয় গানের কলি। শামসুল হক চিশতী (চিশতী বাউল) গানটি গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তার গায়কিতে গানটি আরও বেশি করে শ্রোতা-দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। নসিব বা ভাগ্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসেও বিস্তর বর্ণনা আছে। সুরা হাদিদের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ।’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, সামাজিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করলে এটাই বলতে হয়, ভাগ্যে থাকলে কেউ তা খণ্ডন করতে পারে না। যার ভাগ্যে যা আছে, তা অন্যরা ষড়যন্ত্র করেও বরবাদ করতে পারে না। আল্লাহপ্রদত্ত প্রজ্ঞা, মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। তবে সে পরিবর্তনটাও ভাগ্যের ব্যাপার অর্থাৎ ভাগ্যে না থাকলে পরিশ্রম করেও ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব না। যারা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না, তারা ভিন্নমত পোষণ করলেও শেষ পর্যন্ত নিজের ভালোমন্দের বিচারে মনে মনে ভাগ্যকেই মেনে নিতে বাধ্য হন।

শেখ হাসিনা যদি আর মাস দু-এক ক্ষমতায় থাকতে পারতেন, তাহলে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়তো জেলখানায় থাকতে হতো। সেই ড. ইউনূস আজ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। আর যে হাসিনা তাকে জেলখানায় পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন, তাকেই প্রাণে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। যে ছাত্ররা চাকরিতে কোটা বৈষম্য দূর করার দাবিতে রাজপথে ছিলেন, তারা এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। চাকরি চাইতে গিয়ে হয়ে গেলেন মন্ত্রী। অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত নেতা। রাজনীতি শুদ্ধ করার আন্দোলন করতে গিয়ে হয়ে গেলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ। আট মাস আগেও যারা ছিলেন নেহাত গুরুত্বহীন, তাদের সঙ্গেই বিশেষ বৈঠক করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

যে খালেদা জিয়াকে দিনের পর দিন বন্দি রাখা হয় জেলখানায়, চিকিৎসার জন্য বিদেশ পর্যন্ত যেতে দেওয়া হয়নি। যার মৃত্যু কামনা করে সরকারপ্রধান কটূক্তি করেছিলেন, সেই খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে পরিবারের সঙ্গে এবার ঈদ উদ্‌যাপন করেছেন। এখন মুক্ত এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল ওয়ান-ইলেভেন সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়। অনেক মামলায় তাকে শাস্তিও দেওয়া হয়। লন্ডন থেকে তারেক রহমানকে ধরে এনে বিচার করা হবে বলে হুংকারও দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেই তারেক রহমান এখন সব মিথ্যা মামলা থেকে মুক্ত। তিনি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা। গত ১৭টি বছর তিনি লন্ডনে বসে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিকে রক্ষা করেছেন।

বেগম খালেদা জিয়া টানা ৪০ বছর ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়িতে বসবাস করেছেন। ওই বাড়িটি স্বাধীনতার ঘোষকের বাড়ি। একজন সেক্টর কমান্ডারের বাড়ি। একজন প্রেসিডেন্টের বাড়ি। তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। ওটা ছিল একটা ঐতিহাসিক বাড়ি। সে বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে অপমান-অপদস্থ করে বের করে দেওয়া হয়। বুলডোজার দিয়ে সে বাড়িটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। ওই বাড়ি ভাঙা নিয়ে শেখ হাসিনা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বলেছিলেন, ‘প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ক্যান্টনমেন্টের ওই বাড়িতে তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) বসবাস করতে দেব না। যেদিন সময় আসবে ওই বাড়ি থেকে বের করে দেব। বের করে দিয়েছি।’ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে একজনকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার বিপরীতে প্রকৃতির প্রতিশোধ হলো তার পিতার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িটি জনতার রোষে পড়ে ধুলায় মিশে গেল। ওই বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর বিক্ষুব্ধ জনতাকে প্রস্রাব করতেও দেখা গেছে।

যে আদালতে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল, সে আদালতেই এখন শেখ হাসিনার বিচার চলছে। যে আইনে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করেছিল, সে আইনেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া হয়তো চলবে। গত আট মাসে মোটা দাগে যে বিষয়গুলো দেশবাসী প্রত্যক্ষ করল, এ সবই হলো ভাগ্য বা নসিবের লিখন। মহান আল্লাহতায়ালা যার নসিবে যা লিখেছেন, তিনি তা-ই পেয়েছেন।

যারা কর্মে বিশ্বাসী মানুষ, তারাও গত আট মাসের হিসাব মিলিয়ে দেখবেন। কর্মের ফলেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়েছেন। আর কর্মের ফলেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ভাগ্যে বা নসিবে বিশ্বাসী বা কর্মে বিশ্বাসী সবার জন্যই একই শিক্ষা। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে যার নসিবে যা আছে, তিনি তা-ই পাবেন। শুধু শুধু নানা ষড়যন্ত্র করে কোনো লাভ নেই। ষড়যন্ত্র করলে শত্রুতা বাড়বে, নিজেদের মধ্যে হানাহানি বাড়বে, ভাগ্য বা নসিব পরিবর্তন হবে না।

অনেক বছর পর এবার দেশবাসী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদের আনন্দ উপভোগ করলেন। কর্তৃত্ববাদী শাসন নেই, গুম-খুনের ভয় নেই। যারা দীর্ঘদিন বাড়িঘর ছাড়া ছিলেন তারা নিজের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছেন। নয় দিনের দীর্ঘ ছুটিতে মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছেন। বেপরোয়া যান চলাচল অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে ছিল স্বস্তির যাত্রা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। সেখানে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়তে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত হয়ে যারা স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন, তাদের জন্য দোয়া করব। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় ঐক্য গড়তে হবে। আমরা যেন স্থায়ী একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে সামনে এগিয়ে যেতে পারি সেজন্য কাজ করতে হবে। যারা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে আত্মাহুতি দিয়েছেন, আমরা অবশ্যই তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। যত বাধাই আসুক, ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’ ঈদের জামাতে দাঁড়িয়ে প্রধান উপদেষ্টার এমন ইস্পাতকঠিন উচ্চারণ জাতিকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা বীরের জাতি, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। জাতি তার বীরত্ব বারবার প্রদর্শন করেছে। সর্বশেষ বীরত্ব প্রদর্শিত হয়েছে ৫ আগস্ট। জাতির ওপর চেপে বসা জগদ্দল পাথর সরানো সম্ভব হয়েছে। তবে এও সত্য, গিরিঙ্গিবাজি বা বেইমানিও রয়েছে জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সে কারণেই নানা ষড়যন্ত্রে এ জাতির মধ্যে নানা অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। শিশুতোষ পাঠ্যবইয়ে প্রায় সবাই পড়েছি ‘একতাই বল’। অথচ কর্মজীবনে আমাদের মধ্যে শিশু বয়সের সেই মৌলিক শিক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটছে না। বরং পদে পদে একতার বিপরীত কর্মকাণ্ডই বেশি হচ্ছে। সে কারণেই হয়তো প্রধান উপদেষ্টা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, সংস্কার, নির্বাচন যা-ই হোক না কেন, সবার আগে দরকার ঐক্যবদ্ধতা। জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে ঐক্য না থাকলে সুন্দর একটি সাম্য-সম্প্রীতির দেশ হিসেবে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সাময়িক ঐক্য হলে হবে না। নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হবে। আর এ বিপ্লব ব্যর্থ হলে জনরোষ থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। সে জনরোষ রূপ নিতে পারে আরও একটি নতুন বিপ্লবে।

মেশকাত শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, ‘একজন মানুষ সব সময়ই তার সঙ্গীসাথি দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করার আগে তার বিশ্বাস ও জীবনাচার সম্পর্কে খোঁজখবর নাও।’ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার দ্বারা মনোনীত। এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টামণ্ডলী ও সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা অতীতে কখনো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেননি। সে কারণে গত আট মাসে তাদের কাজের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সেই সঙ্গে দায়িত্বশীল প্রত্যেকের চারপাশে নতুন নতুন ধান্দাবাজ আগাছা সঙ্গীসাথিও গজিয়ে উঠেছে। এসব ধান্দাবাজ আগাছা সরকারের ভিতরে নানাভাবে ঢুকে পড়ছে। প্রধান উপদেষ্টা যে জাতীয় ঐক্য ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন, তারা এ শুভ উদ্যোগে অন্তরায় সৃষ্টি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো অগণিত বিশেষজ্ঞ সরকারকে নানাভাবে প্রতিনিয়ত উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এসব উপদেশ-নির্দেশ শুনলে যে কারওই মাথা গরম হওয়ার কথা। সরকারের নানা দুর্বলতার কারণেই এসব উপদেশ-নির্দেশদাতা গোষ্ঠীর জন্ম হচ্ছে। ধান্দাবাজ আগাছা উপদেশদাতাদের উদ্দেশ্য হলো দেশে যাতে স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয় সেজন্য যা যা প্রয়োজন তা করা। সে কারণে যত বাধাই আসুক না কেন, স্থায়ী জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে নতুন বাংলাদেশ অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য যেমন দরকার স্থায়ী জাতীয় ঐক্য, তেমন দরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। জাতীয় ঐক্য ও নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তত বেশি সময়ক্ষেপণ হবে। সেই সঙ্গে ইমেজ নষ্ট হবে বিশ্বব্যাপী সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। মনে রাখতে হবে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুধু আমাদের নেতা নন, তিনি হলেন বিশ্বনেতা। তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে, তিনি ব্যর্থ প্রমাণিত হলে তা হবে জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আর তাতে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুযোগটা হাতছাড়া হবে চিরতরে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

আরও খবর