আইন-আদালত

প্রশাসক নিয়োগের নেপথ্যে: শূন্যতা পূরণ নাকি দলীয় পুনর্বাসনের ছক?

  একুশ প্রতিবেদন ২১ মার্চ ২০২৬ , ২:৩৯:১৬

স্থানীয় সরকারে কি ফিরছে পুরনো দখলদারিত্ব?

ভূমিকা:
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে সরকার একে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের পদক্ষেপ বললেও, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশ একে দেখছে ‘রাজনৈতিক দখলের’ নতুন কৌশল হিসেবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি স্রেফ ক্ষমতার হাতবদল দেখছি, নাকি কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছি?
. প্রশাসনিক শূন্যতা বনাম রাজনৈতিক পুনর্বাসন

* সংকটের সূত্রপাত: ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ সমর্থিত জনপ্রতিনিধিরা আত্মগোপনে চলে গেলে স্থানীয় সরকারে স্থবিরতা তৈরি হয়। প্রাথমিক সমাধান হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের (ডিসি, ইউএনও) দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়।
* বিতর্কের কারণ: ১১টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত বা পরাজিত নেতাদের ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসনের’ একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২. ‘দখলের রাজনীতি’ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ

* আস্থার সংকট: যদি ৫ আগস্টের ত্যাগের পর আবারও দলীয় ভিত্তিতে পদ দখল শুরু হয়, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে।
* নির্বাচনী নিরপেক্ষতা: স্থানীয় পর্যায়ের এই প্রশাসকরা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নিজ দলের পক্ষে মাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যা একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করে।

৩. কেন কাঠামোগত সংস্কার জরুরি?
কেবল নির্বাচন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন:

* আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন: স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে স্বাধীন বাজেট ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া।
* স্থায়ী আইনি কাঠামো: সংকটকালীন সময়ে দলীয় ক্যাডার নয়, বরং পেশাদার নিরপেক্ষ প্যানেল বা জুডিশিয়াল বডির মাধ্যমে সাময়িকভাবে স্থানীয় সরকার পরিচালনার স্থায়ী আইন প্রণয়ন করা।
* ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: সব সিদ্ধান্ত ঢাকা-কেন্দ্রিক না রেখে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া যাতে জনগণের সরাসরি জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

৪. জনদাবি ও নতুন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা
রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা কমাতে চাইবে না। তাই পরিবর্তনের ধারা বজায় রাখতে নতুন কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন:

* নাগরিক ওয়াচডগ: বড় দলগুলোর বাইরে ছাত্র-জনতা ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে শক্তিশালী নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যারা সংস্কারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।
* তৃণমূল কমিটি: স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসকদের কাজের ওপর নজরদারির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ড বা পাড়া পর্যায়ে নাগরিক কমিটি গঠন।
* নতুন রাজনৈতিক ধারা: পুরনো দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরে তৃতীয় শক্তির উত্থান যারা কেবল ক্ষমতায় যাওয়া নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের এজেন্ডা নিয়ে কাজ করবে।

উপসংহার:
প্রশাসক নিয়োগ যদি কেবল দলীয় আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হয়, তবে অভ্যুত্থানের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না। পরিবর্তনের অর্থ কেবল চেহারার পরিবর্তন নয়, বরং শোষণের ব্যবস্থার পরিবর্তন। জনদাবির মুখে এই কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও খবর