অর্থনীতি

হরমুজ প্রণালী সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি

  একুশ প্রতিবেদন ২০ মার্চ ২০২৬ , ২:০২:৩৯

হরমুজ প্রণালী সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ও বিশেষ প্রতিবেদন | ২০ মার্চ, ২০২৬
বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক ইরানি হামলার ঘটনায় টালমাটাল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। এই সংকট নিরসনে ইউরোপীয় দেশসমূহ ও জাপান একজোট হয়ে ‘উপযুক্ত প্রচেষ্টা’র ঘোষণা দিলেও সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে বিকল্প পথ ও কূটনৈতিক কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ঢেউ এখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর দোরগোড়ায়।
বিশ্বশক্তির অবস্থান: যুদ্ধ নয়, পর্যবেক্ষণ ও চাপ
গত ১৯শে মার্চ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং জাপান এক যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। তারা ইরানের ড্রোন হামলা ও মাইন স্থাপনের তীব্র নিন্দা জানালেও আপাতত বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে নারাজ। এর পরিবর্তে তারা:
* নৌ-টহল ও পর্যবেক্ষণ: বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নজরদারি বাড়ানো।
* অর্থনৈতিক চাপ: সরাসরি যুদ্ধের বদলে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
* জরুরি মজুদ: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর মাধ্যমে তেলের জরুরি মজুদ উন্মুক্ত করে বাজার স্থিতিশীল রাখা।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাল্টা কৌশল
সংকটের কেন্দ্রে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতি রক্ষায় ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে:

* সৌদি আরবের বিকল্প রুট: হরমুজ প্রণালীকে এড়িয়ে সৌদি আরব তাদের ১২০০ কিমি দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু (Yanbu) বন্দরে সরিয়ে নিচ্ছে। এতে তাদের রপ্তানি প্রায় অর্ধেক সচল রয়েছে।
* কাতারের কঠোর পদক্ষেপ: এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করেছে এবং প্রতিবাদস্বরূপ ইরানি কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছে।
* নিরাপত্তা জোরদার: কুয়েত ও বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট ও প্রস্তুতি
হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি বিশ্লেষণে যা উঠে এসেছে:
১. আমদানি ও সরবরাহ ঝুঁকি: বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬৫-৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এই সরবরাহ সরাসরি বাধাগ্রস্ত হবে।
২. বর্তমান মজুদ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েলের যে মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ দিন স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।
৩. অবকাঠামো: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ সম্প্রতি ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ এবং মহেশখালীতে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM)’ প্রকল্প চালু করেছে। তবে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তেলবাহী জাহাজ না পৌঁছালে এই অবকাঠামো সচল রাখা কঠিন হবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
এই সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরণের লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে। ডলার সংকটের এই সময়ে তেলের উচ্চমূল্য পরিশোধ করা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
উপসংহার:
বিশ্বশক্তিগুলো যখন লোহিত সাগরের মতো বিকল্প রুট ও কূটনৈতিক পথে সংকট সামাল দিতে ব্যস্ত, বাংলাদেশ তখন তার সীমিত মজুদ ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা নিয়ে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশকে এখনই রাশিয়া বা মধ্য-এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিকল্প জ্বালানি আমদানির পথ খুঁজতে হবে।

আরও খবর