বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ১১ মার্চ ২০২৫ , ১০:৪২:৩৩
কর কমিয়ে হলেও এখনকার মিথ্যা তথ্যে জমি কেনার পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ফ্রিল্যান্সারদের সেবা রপ্তানির জন্য যতটুকু সেবা আমদানি করা হয় সেখানে কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের-এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, কর অব্যাহতির কথা বলবেন না।
মঙ্গলবার ঢাকার আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে এনবিআরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, “আমি একটা কথা বলি। কর অব্যাহতির কথা বলবেন না। কর দিয়ে কেউ দেউলিয়া হয় না।
“সৈয়দ মুজতবা বলেছেন, বই কিনে দেউলিয়া হয় না। আমি বলবো, কর দিয়ে দেউলিয়া হয়েছে বলে শুনি নাই।”
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশে (আইসিএমএবি) কর অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছিল।
আইসিএমবির তরফে বলা হয়, পোশাক শিল্পে বা অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল হিসেবে আনা পণ্যের করভার শূন্য হলেও ফ্রিল্যান্সর সেবার ক্ষেত্রে সে সুবিধা পাওয়া যায় না।
তবে প্রতিষ্ঠানটির এ প্রস্তাবের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়ে জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “কর তো আয়ের ওপর, ব্যয়ের ওপর না। তাহলে দিতে সমস্যা কোথায়। নতুন করে কর অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলবেন না। আমরা চাই যতটুকু আছে তাও কমিয়ে আনা, ধীরে ধীরে কর অব্যাহতি তুলে দেওয়া।”
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় পেশাজীবি সংগঠন আইসিএমএবি সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন ও ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড অ্যাকান্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) সভাপতি মারিয়া হাওলাদার নিজেদের প্রতিষ্ঠানের তরফে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন।
এছাড়া ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি), বাংলাদেশ ট্যাক্স লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনাল ফোরাম এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় জমির মৌজা মূল্য হালনাগাদ করার বিষয়ে আইসিএবির পক্ষ থেকে স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে ভূমির ও ফ্ল্যাটের বাজার মূল্যের তুলনায় মৌজা মূল্য কম হওয়ায় অপ্রদর্শিত অর্থের সৃষ্টি হচ্ছে। জমি ও ফ্ল্যাটের মৌজা মূল্য সময় সময় হালনাগাদ করে ডেটাবেজ তৈরি করা দরকার।
“এর মাধ্যমে এনবিআরের রাজস্ব হ্রাস এবং অপ্রতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
প্রস্তাবের পক্ষে তার যুক্তি, “মৌজা মূল্য হালনাগাদকৃত না থাকায় বিক্রয়কারীর সম্পদের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শিত হচ্ছে না। ফলে সে অপ্রদর্শিত সম্পদ ও সেটা থেকে অর্জিত আয় প্রতিফলিত হচ্ছে না।
“অপরদিকে অনেকাংশেই সে নিম্ন মৌজামূল্যের ফলশ্রুতিতে ক্রেতাদের প্রকৃত আয়ের উৎস আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত হচ্ছে না। ফলে এনবিআর সারচার্জসহ অন্যান্য রাজস্ব আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে।”
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, জমির প্রকৃত মূল্য মৌজায় নিয়ে আসার পক্ষে তিনি। তব এতে জমি নিবন্ধনের খরচ বেড়ে যাওয়ার সমস্যা দেখছেন তিনি।
“আমরা কর ব্যাপকহারে কমাতে চাই। ধীরে ধীরে এটা নুন্যতম করতে চাই, সমস্যা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কী করবে। আমাদের কাজ আমরা করবো।”
কর কমিয়ে হলেও এখনকার মিথ্যা তথ্যে জমি কেনার পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান দেশে ব্যবসা পরিচালনা করলেও কার্যালয় না থাকায় তারা কর দিতে চায় না তুলে ধরেন স্নেহশীষ বলেন, “বিদেশি বিভিন্ন প্রকল্পে প্রযোজ্য কর সরকারে ওপর চাপানো হয়। এখানে বড় ধরণের কর ফাঁকি হয়।”
তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ী কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশে আয় করে তাহলে তাকে কর দিতে হয়। আমরা গুগল, আমাজনকে এখন ডিজিটাল সার্ভিসে আনতে পারবো না। তারা হয়তো উল্টো ট্যারিফ বসাবে।”
যেসব বড় বড় প্রকল্প অতীতে হয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশেই হয়েছে তুলে ধরে স্নেহশীষ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সে সব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে শাখা কার্যালয় ও লিয়াজোঁ অফিস আছে। প্রকল্প হচ্ছে সে প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, যেখান থেকে আয় হয়। কিন্তু তাদের করের দায় নিচ্ছে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, যা বকেয়া থেকে যাচ্ছে।
কীভাবে এসব কোম্পানি ব্যবসা করছে তা তুলে ধরে তার ভাষ্য, তারা (কোম্পানি) একটা সার্টিফিকেট পায়, রেজিষ্ট্রেশন পায়, বিদেশ থেকে আসে। তাদের কাছ থেকে কেবল উৎসে কর কর্তনের টাকা নিয়ে খুশি বাংলাদেশ।
“আমাদের কী কেবল উৎসে কর কর্তনের টাকা নিয়ে খুশি থাকা উচিত, না কী তাদের আয়ের উপর থেকে কর আদায় করা উচিৎ?”
আইন অনুযায়ী আয়কর আদায় করা উচিত মন্তব্য করে স্নেহাশীষ বলেন, “এটা আইনের সমস্যা নয়, এটা বাস্তবায়নের সমস্যা। এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান যাদের বাংলাদেশ থেকে আয় হচ্ছে তারা যেন বাংলাদেশেই কর দেয়।”
এগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে তুলে ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি প্রকল্পে নেওয়া বিষয়বস্তুর কাঠামো ঠিক করতে হবে। সেখানে আলাদা করে করের কথা বলতে হবে।
এখানে ব্যাপক কর ফাঁকির সুযোগ আছে তুলে ধরে আবদুর রহমান বলেন, সমস্যাগুলো চুক্তির ভেতরে। যখন চুক্তির ভেতরেই বলে দেয় পেমেন্ট দেশের বাইরে হবে, করটা প্রকিউরমেন্ট ইনটিটি দিবে কন্ডাকটর দিবে না। তখনই সমস্যাটা তৈরি হয়। এই যায়গায় আমাদের বড় দিক নির্দেশনা লাগবে। কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত।”
বড় প্রকল্পের মাধ্যমে এদেশে ব্যবসা করলেও করের বোঝা সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য, “বড় বড় প্রকল্প। ১ হাজার কোটি টাকা, দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। ব্যবসাটা তারা এখান থেকে করছে কিন্তু করটা তারা চাপিয়ে দিচ্ছে এদেশের সরকারের উপর। এখান থেকে বের হওয়া উচিত।”
আইসিএবির তরফে আরও বলা হয়, করদাতার রিটার্নে যেন সমস্ত সম্পদ প্রতিফলিত হয় তা নিশ্চিত করতে, ই-টিআইএন অবশ্যই বিআরটিএ, ভূমি রেকর্ড অফিস এবং সিটি করপোরেশনের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। এই ধরনের অটোমেশন সম্ভাব্য কর দাখিলকারীদের কর জালের আওতায় আনা নিশ্চিত করবে এবং তাদের কোনো ঝামেলা ছাড়াই অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে উৎসাহিত করবে।
আইসিএবি বলছে, আইসিএবি ও এনবিআরের যৌথ উদ্যোগে ‘ডিভিএস’ (ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম) চালু করা হয়েছে। এতে করে খাতভিত্তিক মুনাফা, বিক্রি- এগুলো নির্ণয় করা সম্ভব। যার ভিত্তিতে যৌক্তিক উৎসে করের হার নির্ধারণ করা সম্ভব। বর্তমানে বহু ধারায় উৎসে কর আরোপের বিধান আছে। এর ভেতর কিছু কিছু খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব উল্লেখযোগ্য নয়। করদাতাদের উপর এমন বিপুল সংখ্যক উৎসে করের পরিপালন ও হিসাব রাখা দূরূহ।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও এত বিপুল সংখ্যক খাতের কর কর্তন তদারক করতে অসুবিধায় পড়ছে। হিসাবরক্ষণের মানোন্নয়নের নতুন বিধানাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে আয় সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রাজস্বের জন্য উৎসে করের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। এ অবস্থায়, উৎসে কর কর্তনের খাতের সংখ্যা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা যেতে পারে।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম