একুশ প্রতিবেদন ২২ এপ্রিল ২০২৬ , ৭:৫০:৩০
অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, ‘জনস্বার্থের পরিপন্থী সব শর্ত প্রত্যাখ্যান’; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই আটকে আছে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে কঠিন শর্তের মুখে পড়ে নীতিগত ও রাজনৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে বাংলাদেশের সরকার। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাজেট চাপ মোকাবিলায় জরুরি এই অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে নির্বাচনি ইশতেহার ও জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শর্ত মেনে নিতে নারাজ ক্ষমতাসীন দল। এর জেরে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ষষ্ঠ কিস্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক অনিশ্চয়তা।

ক. পটভূমি ও ঋণের বর্তমান অবস্থা:
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা বেড়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পেলেও গত ডিসেম্বরেই বরাদ্দ ছিল ষষ্ঠ কিস্তির ১.৩ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের মূল শর্ত: রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বার্ষিক ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিতকরণ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। কিন্তু রাজস্ব আয় কম, ভর্তুকি কমানো যায়নি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে এবং বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক হয়নি।
খ. সরকারের অবস্থান ও দ্বিধা:
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “জনস্বার্থের পরিপন্থী সব শর্ত প্রত্যাখ্যান করা হবে।” তার মতে, পূর্ববর্তী অগণতান্ত্রিক সরকারের নেওয়া কর্মসূচি এবং তার শর্তগুলো বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো:
· রাজস্ব খাত: বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় কর-জিডিপি অনুপাত বার্ষিক ০.৫ শতাংশ হারে বাড়ানোর যে বাধ্যবাধকতা, তা পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্তির প্রস্তাব বাস্তবায়ন আটকে গেছে।
· ভর্তুকি নীতি: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার শর্ত জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনা করে সরকার কৃষি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি বহাল রাখতে বদ্ধপরিকর।
· ব্যাংকিং সংস্কার: খেলাপি ঋণ কমানো ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের শর্তের বিপরীতে সরকার ব্যাংক রেজ্যুলেশন বিল-২০২৬-এ পুরনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখায় আইএমএফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গ. অর্থনৈতিক প্রভাব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফের অর্থ ছাড় বিলম্বিত হলে রিজার্ভ আরও সংকুচিত হবে, জ্বালানি আমদানি ব্যয় নির্বাহ কঠিন হবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব না বাড়িয়ে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা দেশকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলতে পারে। তবে অর্থমন্ত্রীর দাবি, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাজেট সহায়তা সংক্রান্ত আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। পাশাপাশি আইএমএফের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
ঘ. রাজনৈতিক মাত্রা ও সমালোচনা:
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমির অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার কঠিন শর্তে ঋণ নিয়ে জনগণকে জিম্মি করে রেখেছিল। অন্যদিকে সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন বিলকে ‘দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত করা’ আখ্যা দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। তবে সরকারের দাবি, নির্বাচনি ইশতেহারের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্লেষণ:
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের নীতি নির্ধারণের সময় ‘জনস্বার্থ’ ও ‘আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা’-এর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, রাজস্ব বৃদ্ধির বিকল্প নেই, তবে তা হতে হবে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপের মাধ্যমে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

















