
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারগুলোতে এবার নামেই সাহ্রি-ইফতার হচ্ছে। সেখানে নেই কোনো প্রাণ, কোনো উচ্ছ্বাস, আনন্দ। গত বছর রমজানেও পরিবারের যে প্রিয় সদস্যটি সাহ্রি ও ইফতারে বাড়ি মাতিয়ে রাখতেন বা রাখত, সেই সদস্যটি এবার নেই, আর কখনো ফিরবেও না। তাঁদের জায়গা হয়েছে সরকারের খাতায়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এ শহীদদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। গত ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন। আন্দোলনে গিয়ে ‘কারও পানি লাগবে, পানি, পানি…’ বলে পানি বিতরণ করছিলেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। পুলিশের গুলিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে তিনি মারা যান। মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান (স্নিগ্ধ) হাসপাতালে গিয়ে ভাইয়ের মরদেহ প্রথম দেখেছিলেন।
মীর মাহবুবুর রহমান তাঁর ফেসবুকে ভাইকে নিয়ে লিখেছেন—‘আগে মুগ্ধ খুলনা থেকে কবে ফিরবে তা নিয়ে মা অপেক্ষা করতেন। মুগ্ধ ঢাকায় ফেরার পর মায়ের মুখে একটা হাসি লেগেই থাকত আর বিশেষ খাবার রান্না করতেন। এ নিয়ে স্নিগ্ধ আর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান (দীপ্ত) মাকে খেপাতেন।’ স্নিগ্ধ ফেসবুকে লিখেছেন—‘আমি জানি আজকে ইফতারের সময় আম্মু কাঁদবে, অবশ্যই কাঁদবে আর বলবে আমার মুগ্ধটা আর বাড়ি ফিরবে না।’
মীর মাহমুদুর রহমান আজ রোববার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, রমজানে মা শাহানা চৌধুরীর কাছে কোরমা বা অন্য খাবার খেতে চাইলেই বলতেন আগে মুগ্ধ আসুক। মায়ের হাতের ডিম চপ, ডিম পিঠা আর পুডিং খেতে খুব পছন্দ করত মুগ্ধ। মা মুগ্ধকে একটু বেশি খাবার দেয়, এটা বললে তা মুগ্ধ খুব উপভোগ করত।
মুগ্ধ ২০২৩ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে স্নাতক শেষ করেন। ঢাকায় ফিরে গত বছরের মার্চ মাসে ভর্তি হয়েছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি)। প্রফেশনাল এমবিএ করছিলেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করতেন।

পবিত্র রমজানে নাঈমা মাকে কোন কোন খাবার রান্না করতে হবে বলে দিত। মাঝে মাঝে নিজেও রান্না করে মায়ের কাজ কমিয়ে দিত। ইফতারের সময় বিরিয়ানি, খাসির মাংস দিয়ে কাচ্চি, চিকেন ফ্রাই এসব খাবার পছন্দ করত। আজ আইনুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার প্রথম সাহ্রিতে বলতে গেলে এক লোকমা ভাতও ভালোভাবে খেতে পারিনি। খেতে হবে তাই শুধু গিলেছি। যত দিন যাচ্ছে ততই মেয়েটার স্মৃতি বেশি করে মনে হচ্ছে। এখনই চিন্তা হচ্ছে নাঈমাকে ছাড়া আমরা কীভাবে ঈদ করব?’ উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের দশম শ্রেণিতে পড়ত নাঈমা।
সাবরিনা আফরোজ সাহ্রির সময় ভাই মাহামুদুর রহমানকে (সৈকত) ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন, তারপরও ঘুম ভাঙানো যেত না। তবে এবার আর কাউকে ডাকতে হয়নি। সাবরিনা বললেন, ‘আমাদের মতো শহীদ পরিবারগুলোতে আর কখনোই সাহ্রি, ইফতার, ঈদ—এমন উৎসবগুলো আসবে না। আমার ভাইটা খেতে খুব পছন্দ করত। ইফতারের সময় ডিম চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু একবার খেত, পরে রাতে আবার খেত। সাহ্রি শেষ করে ভাইটা মায়ের সঙ্গে এক কাপ চা খেত। এবার মা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সেই চা খেয়েছেন।’

সাবরিনা আফরোজ ভাই হত্যার মামলার বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘মামলা করেছি। যে পুলিশের গুলিতে আমার ভাইটা মরল সেই পুলিশটাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক। আমাদের পরিবারে যেমন কোনো উৎসব নেই, খুনিদের পরিবারেও কোনো আনন্দ থাকবে না, তা দেখতে চাই। এটুকু তো চাইতেই পারি।’
১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের মাথায় (মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে) সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের গুলিতে মারা যান সৈকত। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার সৈকত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি।

রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের জ্যেষ্ঠ উপপরিদর্শক মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে ইমাম হাসান ভূঁইয়া (তাইম)। ছেলের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৯ বছর। নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি।
পুলিশের বিরুদ্ধে ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেছেন তাইমের মা পারভীন আক্তার। কিন্তু মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশ তাইমের বড় ভাই রবিউল আউয়াল। তিনি বলেন, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরও আসামি ধরা হচ্ছে না। মামলা করা শহীদ পরিবারের সদস্যদের কোনো নিরাপত্তা নেই।
ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে রবিউল আউয়াল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইটা সাহ্রির সময় সবাইকে ডেকে তুলত। ইফতারের আগে সালাদ বানানো, জিলাপি কেনা এসব করত। বলতে গেলে ইফতারের সময় সেই মাকে সাহায্য করত। এবার তো আমাদের পরিবারে শুধু কান্না আর কান্না। বাবা এখনো ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি। মা প্রায় সময়ই ভাবেন, তাইম এখনই ফিরবে।’