১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ বেলা একটার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। জেনারেল ইয়াহিয়া খান রেডিওতে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে লক্ষ মানুষ। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলনের সেই দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায় — যখন একটি সমগ্র জাতি, একটি রাষ্ট্রের সকল কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের ভাগ্য নিজে নির্মাণ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
০১
অধিবেশন স্থগিত — ক্রোধের আগুন
ডিসেম্বর ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পাকিস্তানি সামরিক চক্র মিলে সেই পথ রুদ্ধ করতে উদ্যত হয়। পহেলা মার্চ ইয়াহিয়া খানের হঠকারী ঘোষণা মূলত সেই ষড়যন্ত্রেরই প্রকাশ্য রূপ।
খবর ছড়িয়ে পড়তে বিলম্ব হয়নি। ঢাকার পল্টন, নিউমার্কেট, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন। অফিস-আদালত, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ থেকে ৬ মার্চ সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেন। পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনজাগরণ আর দেখা যায় নাই।
রাজপথে লক্ষ কণ্ঠ
ইয়াহিয়ার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা পরিণত হয় এক জ্বলন্ত আন্দোলনের কেন্দ্রে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী — সকলে রাস্তায় নামেন। সেদিনের সেই জমায়েত ছিল স্বাধীনতার প্রথম সুস্পষ্ট ঘোষণা।
০২
সমান্তরাল সরকার — মুজিবের নেতৃত্বে
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে কার্যত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই চলতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান। প্রতিদিন তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ও জনসভায় নির্দেশনা দিতেন। সেগুলো ছিল কার্যত একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রের নির্দেশিকা। ব্যাংক, অফিস, কলকারখানা, আদালত সব চলত তাঁর নির্দেশে।
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেন সরকারি কর্মকর্তারা। পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস), বাঙালি সেনাসদস্যরা মানসিকভাবে মুজিবের পক্ষে ছিলেন। রেডিও পাকিস্তান ঢাকার কর্মীরা পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় আন্দোলনের মুখ্য কেন্দ্রে।
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান · ৭ মার্চ ১৯৭১ · রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
০৩
পতাকা ওড়ানো ও পরিচয় নির্মাণ
২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। সেটি ছিল কেবল একটি পতাকা নয়, এক নতুন জাতির আত্মপ্রকাশের প্রতীক।
৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় শাজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করেন। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ঘোষিত সেই ইশতেহারে জাতীয় সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ নির্ধারণ করা হয়। একটি জাতি তার পরিচয় নির্মাণ করছিল প্রতিটি দিনে, প্রতিটি মুহূর্তে।
সবুজ জমিনে লাল সূর্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উড়ল নতুন পতাকা। সবুজ পটভূমিতে লাল বৃত্ত — তার মাঝে বাংলার মানচিত্র। হাজার মানুষের চোখে জল, বুকে উত্তাপ। একটি স্বপ্ন তখন রূপ নিচ্ছে বাস্তবে।
০৪
আলোচনার মঞ্চ — ষড়যন্ত্রের অন্তরালে
১৬ মার্চ থেকে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে মুজিবের সাথে আলোচনা শুরু করেন। ভুট্টোও যোগ দেন পরে। বাইরে দেখা যাচ্ছিল আলোচনার দৃশ্য, কিন্তু অন্দরে চলছিল ভিন্ন নাটক। পাকিস্তান সেনাবাহিনী চুপিচুপি পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্র সমাবেশ করছিল। বঙ্গবন্ধু তা জানতেন, তবু শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেন।
২৩ মার্চ পাকিস্তানের ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’। কিন্তু সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র পাকিস্তানের পতাকার বদলে উড়তে দেখা গেল স্বাধীন বাংলার পতাকা। বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উড়ানো হলো সেই পতাকা। জাতির পিতার এই কর্মটি ছিল পাকিস্তানের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান।
ঢাকা চট্টগ্রাম রাজশাহী খুলনা সিলেট ময়মনসিংহ
০৫
সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ
এই অসহযোগ আন্দোলনের শক্তি ছিল এর সর্বজনীনতায়। কেবল রাজনৈতিক দলের কর্মীরা নন — চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র — সকলে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। রিকশাওয়ালারা রিকশা চালাননি, দোকানদাররা দোকান খোলেননি, সরকারি কর্মকর্তারা অফিসে যাননি — কেবল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে।
জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রেন থেমে গেছে। বন্দরে বিদেশি জাহাজ আটকে গেছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে রাজস্ব পাঠানো বন্ধ হয়ে গেছে। এক ঐতিহাসিক নজির তৈরি হয়েছিল — একটি জনগোষ্ঠী রক্তপাত ছাড়াই একটি রাষ্ট্রকে অচল করে দিয়েছিল।
শ্রেণী-পেশার ঊর্ধ্বে একটি জাতি
ডাক্তার থেকে রিকশাওয়ালা, শিক্ষক থেকে কৃষক — সকলে একই কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। এই অভূতপূর্ব জনঐক্যই ছিল অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি।
০৬
২৫ মার্চের কালরাত — আন্দোলনের পরিণতি
২৫ মার্চ রাত ১১টার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় শুরু হয় নির্মম গণহত্যা। সেই রাতে শেষ হয়ে যায় শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের অধ্যায়। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। সেই ঘোষণাই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জন্মলিপি। অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি সংগ্রাম আসলে এই মুহূর্তের প্রস্তুতি ছিল — একটি জাতির চূড়ান্ত অঙ্গীকারের ভূমিকা।
বিশ্ব ইতিহাসে অসহযোগ আন্দোলনের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে — মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতে, মার্টিন লুথার কিংয়ের নেতৃত্বে আমেরিকায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন তার মাত্রা ও সাফল্যের দিক থেকে অনন্য।
মাত্র তিন সপ্তাহে একটি সমগ্র জাতি একটি রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দিয়েছিল। এই সময়কালে বঙ্গবন্ধু যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যে শৃঙ্খলা ও সংকল্প বাংলার মানুষ দেখিয়েছিলেন — তা চিরকালের জন্য ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেছে অক্ষয় কালিতে।

















