ফিচার

বৃদ্ধাশ্রম নয়, যত্নের আবাসস্থল: প্রবীণ জীবনের নতুন ঠিকানা

  বাংলানিউজ ২ মে ২০২৬ , ১০:০৭:৪৬

বৃদ্ধাশ্রম নয়, যত্নের আবাসস্থল: প্রবীণ জীবনের নতুন ঠিকানা

সাজিদা ইসলাম পারুল সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

নগরজীবনের ব্যস্ততা, সন্তানের প্রবাসে বসবাস আর ভেঙে পড়া পারিবারিক কাঠামোর মাঝে প্রবীণদের জীবনে বাড়ছে একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা। ফলে দিনে দিনে অনেকেরই বাড়ছে কৌতূহল—জীবনের শেষ অধ্যায় কেমন হবে।

এমন বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতাল (জেবিএফআরএইচ)—যেখানে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নয়, বরং যত্ন, সম্মান ও নিরাপত্তার এক বিকল্প আবাস গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে চিকিৎসা, সঙ্গ এবং মানবিক পরিচর্যার মধ্যে নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন অনেক প্রবীণ।

বদলে যাওয়া সমাজে এটি হয়ে উঠছে শেষ বয়সের এক আশ্রয়স্থল।

বুধবার (২২ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জেবিএফআরএইচ ক্যাম্পাসে অনেক প্রবীণের সঙ্গে দেখা হয়।

অনেকেই নাম-পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি। আবার অনেকে খোলামেলাভাবে জানিয়েছেন নিজেদের জীবনের গল্প।

অনেকে এসেছেন প্রতিষ্ঠানটি দেখতে, খোঁজখবর নিতে।

খুলনার প্রবীণ চিকিৎসক কাজী তৈমুর রহমান প্রায় আট মাস ধরে নিজের সিদ্ধান্তে এখানেই বসবাস করছেন। গুলশানে নিজের বাড়ি, প্রতিষ্ঠিত সন্তান, সচ্ছল জীবন— সবই আছে তার। তবুও কেন এই সিদ্ধান্ত?

ধীর গলায় তার উত্তর—“বাড়ি তো আছে, ছেলে আছে। কিন্তু এখানে থাকতে ভালো লাগে।”

ঢাকার ব্যস্ততা, নিরাপত্তাহীনতা, মসজিদে যেতে অসুবিধা— সব মিলিয়ে একসময় তিনি ভাবেন, অন্য কোনো ব্যবস্থা দরকার। ছেলের সঙ্গে একদিন এই প্রতিষ্ঠানে এসে তার ভালো লেগে যায়।

“আমি বললাম, আমার কাপড়চোপড় নিয়ে আসো, আমি এখানে থাকব”— বলছিলেন কাজী তৈমুর রহমান।

এখানে তার দিন শুরু হয় ফজরের নামাজ দিয়ে। এরপর ছাদে হাঁটা, খোলা বাতাসে সময় কাটানো। বিকেলে অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা, কখনো চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া— এভাবেই দিন কাটছে। তৈমুর রহমান বলেন, “জীবনে যা পাওয়ার পেয়েছি। এখন দেওয়ার আনন্দটাই বড়।”

এই প্রতিষ্ঠানে থাকা প্রবীণদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামও, যিনি ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতিভ্রষ্টতা) ভুগছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের বলেন, “অনেক সময় তিনি কাছের মানুষদেরও চিনতে পারেন না। কিন্তু এখানে প্রথম দিন আমাকে চিনেছিলেন, এটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।”

‘নির্বাসন’ নয়, মর্যাদার জীবন জেবিএফআরএইচে
প্রচলিত ধারণায় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি অনেক সময় নেতিবাচক— যেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক জীবন।

তবে এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছেন আরেক সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি এখানে এসেছেন আগাম বুকিং দেওয়ার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে।

বৃদ্ধাশ্রম মানে নির্বাসন”— এই ধারণাটা এখানে এসে ভেঙে গেছে। এটি আসলে একটি রিটায়ারমেন্ট হোম, যেখানে মর্যাদার সঙ্গে থাকার সুযোগ আছে”—বলেন তিনি।

হোসেন জিল্লুরের মতে, প্রবীণ ব্যক্তিদের যত্ন শুধু পাশে থাকা নয়, এটি একটি পেশাদার সেবা— যেখানে প্রতিদিনের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পূরণে বিশেষায়িত কেয়ার প্রয়োজন।

বাড়ছে প্রবীণ, বদলাচ্ছে সমাজ
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জনে, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। জনসংখ্যার এই একটি বড় অংশ এখন প্রবীণ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যা দেশের সামাজিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা তৈরি করছে।

গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আগে যেখানে সংক্রামক রোগ ও অপুষ্টি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, এখন সেখানে অসংক্রামক রোগ, বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ দশমিক ৬ কোটিতে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ হবে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের একজনই হবেন প্রবীণ।

এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, সামাজিক কাঠামোতেও বড় প্রভাব ফেলছে। যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে ছোট পরিবারে রূপ নেওয়া, কর্মসংস্থানের কারণে সন্তানদের শহর বা বিদেশে অবস্থান এবং নারীদের কর্মজীবনে যুক্ত হওয়ার কারণেও প্রবীণদের দেখভালের প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অসুস্থতা ও শারীরিক অক্ষমতার কারণে অনেক প্রবীণ ধীরে ধীরে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে তারা একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন, যা তাদের শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটায়। বিশেষ করে ডিপ্রেশন, আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগ প্রবীণদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ডিমেনশিয়া বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক যত্নকেন্দ্র গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে তারা নিরাপদ, সম্মানজনক ও পেশাদার পরিচর্যার মধ্যে থাকতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত বর্ধনশীল এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এটি বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই এই ধরনের যত্নের জায়গা তৈরি করা জরুরি।”

আধুনিক সেবা
প্রবীণদের সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান জেবিএফআরএইচ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এখানে পদ্মা, মেঘনা, সুরমা ও যমুনা নামে চারটি ভবনে রয়েছে ২৩২টি অত্যাধুনিক স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট। প্রতিটি ভবনের নকশা একই। এসব অ্যাপার্টমেন্টে বসেই প্রবীণরা চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ কেয়ারগিভারের তত্ত্বাবধানে সার্বক্ষণিক সেবা পাচ্ছেন। স্থায়ী বসবাসের পাশাপাশি দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতেও কেয়ার সার্ভিস নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পুষ্টিবিদদের তত্ত্বাবধানে পরিপাটি করে সাজানো খাবার পৌঁছে যায় তাদের কক্ষে।

জেবিএফআরএইচের উপ-পরিচালক মহসিন কবির বাংলানিউজকে বলেন, “বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রবীণ বলা হয়। ৬০ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক এখানে থাকতে পারবেন। এটি উপমহাদেশের অন্যতম বড় প্রবীণকেন্দ্রিক প্রকল্প। এখানে দম্পতি বা এককভাবে থাকা যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানের ফাইভ-স্টার ক্যাটাগরির একটি রিটায়ারমেন্ট হোম।”

তিনি আরও বলেন, “যারা তুলনামূলক সুস্থ, তারা এখানে থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা পান। প্রতিদিন দুইবার চিকিৎসক দেখেন, নিয়মিত ভাইটাল সাইন পরীক্ষা করা হয়, পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। আর যারা সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী, তাদের গোসল করানো, টয়লেট পরিষ্কার, খাওয়ানো থেকে শুরু করে হুইলচেয়ারে ঘোরানো, রোদে নেওয়া— সবকিছুতেই কেয়ারগিভারের সহায়তা দেওয়া হয়।”

মহসিন কবির জানান, সুস্থ প্রবীণরা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, অসুস্থরা হাসপাতালে এবং যারা জীবনের শেষ পর্যায়ে, তারা হসপিস বা এন্ড-লাইফ কেয়ার সেন্টারে থাকেন। বিনোদনের জন্য রয়েছে সুইমিং পুল, সাউনা, জাকুজি, জাপানি মডেলের ওয়াকিং এরিয়া। এমনকি শয্যাশায়ী প্রবীণদেরও বিছানাসহ ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে তারা আকাশ দেখতে পারেন, রোদ পেতে পারেন। মুভি থিয়েটার, সুপারশপসহ সব মিলিয়ে এটি প্রবীণদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কম্পাউন্ড।

এছাড়া, এখানে জিম, স্টিম বাথ, ল্যাব, ফিজিওথেরাপি সেন্টার, লাইব্রেরি, মুভি থিয়েটার, যোগব্যায়াম ও স্পিরিচুয়াল ওয়েলনেস সেন্টারসহ নানা সুবিধা রয়েছে। শয্যাশায়ী বা হুইলচেয়ারনির্ভর প্রবীণদের জন্য ১৫০ শয্যার কেয়ার সেন্টার এবং জটিল রোগীদের জন্য ৮০ শয্যার পেলিয়েটিভ, টার্মিনাল ও হসপিস কেয়ারের ব্যবস্থা আছে।

জাপানের অভিজ্ঞতার প্রয়োগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে ১৯৮৭ সালে অধ্যাপক সরদার এ নাঈম জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যান এবং সেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর অবস্থান করেন। এই সময় জাপানের সমাজ ও বিশেষ করে প্রবীণদের জন্য গড়ে ওঠা উন্নত সেবাব্যবস্থা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই মানবিক ভাবনা থেকেই তিনি গড়ে তোলেন জেবিএফআরএইচ।

সরদার এ নাঈম বলেন, জাপান প্রবীণসেবায় বিশ্বের অন্যতম অগ্রসর দেশ, যেখানে বয়স্ক মানুষের জন্য পরিকল্পিত ও সমন্বিত কেয়ার সিস্টেম রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশে ফিরে তিনি চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য কিছু করার চিন্তা করেন।

১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে তিনি জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ২০১১-১২ সালের দিকে তিনি একটি সমন্বিত প্রবীণসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন, যা এখন পূর্বাচলের কাছে বাস্তব রূপ পেয়েছে।

জেবিএফআরএইচের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বলেন, সমাজে দুই ধরনের প্রবীণ আছেন— একদল সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, যাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন; অন্যদিকে সচ্ছল কিন্তু একাকী প্রবীণদের জন্য প্রয়োজন পেশাদার চিকিৎসা ও পরিচর্যা।

বার্ধক্যকে তিনি তিন ভাগে ভাগ করেন— ৬০ থেকে ৭০ বছরের (ইয়াং ওল্ড), ৭০ থেকে ৮০ বছরের (মিডল ওল্ড) এবং ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে (ওল্ডেস্ট ওল্ড); যেখানে শেষোক্তদের জন্য বিশেষ যত্ন জরুরি।

সরদার এ নাঈম মনে করেন, প্রবীণদের যত্ন শিশুর মতো নয়; এর জন্য প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার প্রয়োজন। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সেবা দিচ্ছে না, বরং দক্ষ জনবলও তৈরি করছে।

খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি অনেকের কাছে ব্যয়বহুল মনে হলেও শহুরে জীবনযাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে তা অস্বাভাবিক নয়। তবে ভবিষ্যতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ খাতে সরকারের অংশগ্রহণও জরুরি।

তার মতে, বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা একাকিত্ব। তাই এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো— মানুষ যেন জীবনের শেষ সময়টুকু সম্মান, যত্ন ও সঙ্গের মধ্যে কাটাতে পারে। তিনি বলেন, “এটা বৃদ্ধাশ্রম নয়, বরং তাদের জন্য একটি নতুন ঘর।”

এই প্রতিষ্ঠানে স্ত্রী রিফাত সুলতানাকে নিয়ে থাকেন সাবেক রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের (৮৩)। বয়সের ভার, স্মৃতির ক্ষয় আর সময়ের পরিবর্তনের মাঝেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন একটুখানি স্থিরতা। শান্ত গলায় বললেন, “এখানে পরিবেশ ভালো, মানুষজনও আন্তরিক। নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া, যত্ন— সব মিলিয়ে দিন কেটে যাচ্ছে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিন্তে।”

তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা এখন স্ত্রীকে ঘিরেই। রিফাত সুলতানা ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। অনেক কিছুই ভুলে যান, কখনো কাছের মানুষকেও চিনতে পারেন না। তবুও তাকে একা পড়ে থাকতে দেন না আকরামুল কাদের। ছোট ছোট কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন— কাগজ কাটা, কিছু বানানো, হাতের কাজ। যেন মনটা কোথাও আটকে থাকে, ভেসে না যায় পুরোপুরি।

তিনি বলেন, “ওকে ব্যস্ত রাখতে হয়। কিছু একটা নিয়ে থাকলে ওর মন একটু স্থির হয়।”

সেই ব্যস্ততার ভেতরেই রিফাত সুলতানার এক ভিন্ন জগৎ তৈরি হয়েছে। টেবিলের ওপর সাজানো তার বানানো জিনিস— কাগজের ফুল, টিস্যু বক্স, শপিং ব্যাগের কাগজ দিয়ে তৈরি মুখোশ আর ছোট ছোট শোপিস। প্রতিটা জিনিসে যত্নের ছাপ রয়েছে।

একটি মুখোশ হাতে তুলে নিয়ে তিনি বললেন, “এই মুখোশটা নিউ অরলিন্স, আমেরিকা থেকে আনা। আর বাকিটা এখানে এক ছেলেকে দিয়ে আটা দিয়ে লাগিয়ে বিভিন্নভাবে সাজিয়ে বানানো হয়েছে।”

সিরাজুল ইসলাম, আকরামুল কাদেরের মতো প্রতিষ্ঠানটির অ্যাপার্টমেন্টে বর্তমানে মোট ২২ জন নিয়মিতভাবে বসবাস করছেন। ৭০০ স্কয়ার ফিটের ৫-তারকা মানের একেক অ্যাপার্টমেন্টে স্বামী ও স্ত্রী দুজন থাকতে পারেন।

এছাড়া, ছেলেমেয়েরা কয়েক দিনের জন্য বিদেশে গেলে অনেক সময় মা–বাবাকে এখানে রেখে যান বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এখানে অ্যাপার্টমেন্ট কেনারও সুযোগ পাচ্ছেন প্রবীণেরা। ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে ইতোমধ্যে ২২৪টি বিক্রি হয়েছে। তবে সবাই থাকা শুরু করেননি বা ভাড়া হয়নি।

সম্প্রতি এ সেবাকেন্দ্র পরিদর্শনে এসেছিলেন মাহবুবা হক। তিনি বলেন, “এখানে যে ‘রিটায়ারমেন্ট হোম’ তৈরি করা হয়েছে, তা একেবারেই আপন পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রবীণরা কীভাবে হাঁটবেন, কোথায় বসবেন, বাতাস পাচ্ছেন কি না— সবকিছুই তাদের কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা তো মনে হয় আগাম বুকিং দিয়েই ফেললাম! এ ধরনের উদ্যোগ আরও প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি দেখে আমি মুগ্ধ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, সেটি এখানে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে— ছাদ থেকে নিচ পর্যন্ত। সত্যিই প্রশংসনীয়।”

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেবাকেন্দ্রের খবর পড়ে নিজেই ছুটে এসেছেন আমেরিকা থেকে আসা হাসনা ইউসুফ কান্তা। তিনি বলেন, “আমার আমেরিকায় নার্সিং হোম দেখার সুযোগ হয়নি। তবে নিজের দেশ, নিজের ভাষা, নিজের খাবার— এগুলো বড় একটি সুবিধা, বলা যায় এক ধরনের বিলাসিতা। আমার মা ৮০ বছরের বেশি বয়সী এবং হুইলচেয়ারনির্ভর। আমার মনে হয়, অবসরের পরপরই এখানে এলে এই সুবিধাগুলো উপভোগ করা যায়। এটি শুধু জীবনের শেষ সময় কাটানোর জায়গা নয়, এটি বসবাসযোগ্য একটি স্থান।”

ভবিষ্যতের ‘বাতিঘর’
সাবেক উপদেষ্টা গোলাম কাদের এই প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতের একটি ‘বাতিঘর’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “আমাদের মুরুব্বিদের যত্ন নেওয়ার যে সংস্কৃতি আছে, এটিকে আধুনিক রূপ দিয়েছে এই উদ্যোগ।”

একইসঙ্গে হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, “এটি একটি পথপ্রদর্শক উদাহরণ, যেখানে প্রবীণদের জন্য সম্মানজনক ও যত্নশীল আবাস তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।”

জীবনের শেষ সময়ে মানুষ কী চায়? নিরাপত্তা, যত্ন, সম্মান আর একটু শান্তি। রূপগঞ্জের এই উদ্যোগ সেই চাহিদার একটি উত্তর খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

নিজের ঘর ছেড়ে অন্য এক ঘরে এসে কেউ খুঁজে পাচ্ছেন স্বস্তি, কেউ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছেন বার্ধক্য, আবার কেউ দেখছেন ভবিষ্যতের একটি দিশা।

জেবিএফআরএইচ সরদার এ নাঈম ও তার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। আশা ইসলামের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই প্রতিষ্ঠানে থাকা শুরু করেন।

আরও খবর