ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির উত্থান এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী ফিচার নিচে দেওয়া হলো:
মোজতবা খামেনির উত্থান ও জ্বালানি রাজনীতি: কেন যুদ্ধের চেয়ে প্রস্থানই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার?
ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। যেখানে একসময় ওয়াশিংটন তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের (Regime Change) স্বপ্ন দেখত, সেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপট—বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মোজতবার অনমনীয় নেতৃত্ব—যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে একটি সম্মানজনক ‘প্রস্থানের পথ’ খুঁজতে বেশি বাধ্য করছে।
১. মোজতবা খামেনি: ছায়া থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থেকে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি এখন ইরানের আনুষ্ঠানিক সর্বোচ্চ নেতা।
-
আইআরজিসি-র সাথে ঘনিষ্ঠতা: ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ডস (IRGC) এবং গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তার গভীর সম্পর্ক তাকে এক শক্তিশালী অবস্থানে বসিয়েছে।
-
কট্টরপন্থী অবস্থান: দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধের আল্টিমেটাম দিয়েছেন এবং সাফ জানিয়েছেন যে, কোনো প্রকার নতি স্বীকার করা হবে না।
২. জ্বালানি নিরাপত্তার মরণফাঁদ
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালী। মোজতবা খামেনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান এই প্রণালীটিকে মার্কিন শত্রুদের ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।
-
তেলের দামের উর্ধ্বগতি: চলমান উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
-
অর্থনৈতিক ঝুঁকি: জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ধস নামবে, তা সামলানোর সক্ষমতা বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নেই। ফলে যুদ্ধের ব্যয় এবং তেলের উচ্চমূল্য মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভের কারণ হতে পারে।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেনেজুয়েলা সমাধান’ ও প্রস্থানের চেষ্টা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানে একটি ‘ভেনেজুয়েলা সমাধান’ খুঁজছে। অর্থাৎ, সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে শাসনক্ষমতা দখল করার চেয়ে এমন একটি নেতৃত্বকে মেনে নেওয়া যারা বিদ্যমান কাঠামো বজায় রেখেই পশ্চিমাদের সাথে ব্যবসায়িক বা কৌশলগত সহযোগিতা করবে।
-
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মোজতবা খামেনির নিযুক্তিকে ‘বড় ভুল’ বললেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেয়ে দ্রুত একটি সমাধান খোঁজার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
-
ক্ষতি সীমিত করার চেষ্টা: ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সরাসরি যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর (যেমন: সৌদি আরব, বাহরাইন) ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র এড়াতে চায়।
৪. আঞ্চলিক মিত্রদের চাপ
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর নিজেদের মাটিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চায় না। তারা জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা করতে তেহরানের সাথে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার পক্ষপাতী। ওমান ও ইরাকের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যেই মোজতবা খামেনির সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে একলা চলার পথ থেকে সরিয়ে আনছে।
উপসংহার
মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান এখন অনেক বেশি প্রতিরক্ষা-মুখী এবং আক্রমণাত্মক। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় ওয়াশিংটন বুঝতে পারছে যে, তেহরানের সাথে সম্মুখ সমর কোনো সমাধান নয়। বরং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি কৌশলগত প্রস্থানের পথ পাওয়াই এখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।