একুশ প্রতিবেদন ২০ মার্চ ২০২৬ , ৭:৪৮:১৭
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা প্রকাশিত: ২০ মার্চ, ২০২৬
ঢাকা: দেশের নির্মাণসামগ্রীর বাজারে বর্তমানে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের প্রভাবে কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটার অজুহাতে রড, সিমেন্টসহ প্রধান উপকরণের দাম হু হু করে বাড়লেও, বাজারে বিক্রি নেমেছে তলানিতে। উচ্চমূল্যের নির্মাণসামগ্রী, জমির চড়া দাম এবং ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের ত্রিমুখী চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের আবাসন খাত।

রড-সিমেন্টের বাজারে আগুন
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে রডের দাম টনপ্রতি ৪,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিএসআরএম (BSRM)-সহ শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের প্রতি টন রড ৯৬,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে সিমেন্টের দামও বস্তাপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে এখন এক বস্তা সিমেন্ট ৫১০ থেকে ৫৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জাহাজ ভাড়া ও কাঁচামাল আমদানির ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে।
আবাসন খাতে বড় ধস
নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়ায় বড় সংকটে পড়েছে আবাসন খাত। রিহ্যাব (REHAB) সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে ফ্ল্যাটের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি বর্গফুট (SFT) ফ্ল্যাটের দাম গড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বুকিং বাতিল করছেন। অনেক ডেভেলপার কোম্পানি লোকসানের আশঙ্কায় চলমান প্রকল্পের কাজ ধীর করে দিয়েছে অথবা নতুন প্রকল্পে হাত দিতে সাহস পাচ্ছে না।
জমির দাম ও ড্যাপ-এর প্রভাব
নির্মাণ সামগ্রীর পাশাপাশি জমির আকাশচুম্বী দাম আবাসন সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP)-এর নতুন বিধিমালার কারণে অনেক এলাকায় আগের চেয়ে কম তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। ফলে জমির মালিকরা তাদের অংশের হিস্যা ঠিক রাখতে জমির দাম বা ফ্ল্যাটের ভাগ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় গত ৫ বছরে জমির দাম প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যাংক ঋণের মরণকামড়
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার। বর্তমানে গৃহঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩-১৫ শতাংশে ঠেকেছে। এতে মাসিক কিস্তির (EMI) পরিমাণ ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। শুধু ক্রেতাই নয়, তারল্য সংকটের কারণে অনেক ডেভেলপার কোম্পানিও প্রয়োজনীয় প্রকল্প ঋণ (Project Loan) পাচ্ছে না।
ক্রেতা সংকটে মন্দার মুখে ব্যবসায়ীরা
রাজধানীর এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, “যুদ্ধের খবর শুনে দাম বাড়লেও বাজারে ক্রেতা নেই। মানুষ এখন খুব জরুরি না হলে ঘরবাড়ির কাজে হাত দিচ্ছে না।” গত কয়েক মাসে সিমেন্ট ও রডের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞের অভিমত
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে ছিল। এখন আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব সরাসরি নির্মাণ খাতে পড়ছে। এই স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আবাসন শিল্পের সাথে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্মাণ সামগ্রীর আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং সহজ শর্তে গৃহঋণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।















